
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি মধ্যপ্রাচ্য। দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমানে কাজ করছেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ যে ভাষায় এসব দেশের অধিকাংশ কর্মী ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, সেই আরবি ভাষা শেখানোর বিষয়টি এখনো আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরির কাঠামোয় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এটি শুধু প্রশিক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মীদের নিরাপত্তা, আয়, মর্যাদা এবং দেশের রেমিট্যান্স সম্ভাবনা।
প্রশ্ন হলো, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে আমরা তাঁদের কারিগরি দক্ষতা যাচাই করি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করি, কাগজপত্র প্রস্তুত করি; কিন্তু যে দেশে তাঁরা যাবেন, সেই দেশের মৌলিক ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে কেন এত অনীহা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব একাই দিয়েছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। কুয়েত, কাতার ও ওমান থেকেও আসে উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়। এটি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
তাহলে এই বাজারের জন্য কর্মীদের প্রস্তুত করতে আরবি ভাষাকে কেন মৌলিক দক্ষতার অংশ করা হবে না?
ভাষা কেবল কথাবার্তার মাধ্যম নয়। একজন কর্মী ভাষা জানলে নিজের অধিকার সম্পর্কে কথা বলতে পারেন, নিয়োগকর্তার নির্দেশ বুঝতে পারেন, চুক্তির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন এবং বিপদে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভাষা না জানলে তিনি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সেই নির্ভরতা তাঁকে প্রতারণা, মজুরি বঞ্চনা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও নানা ধরনের হয়রানির ঝুঁকিতে ফেলে।
অর্থাৎ আরবি ভাষা শেখানোকে ‘অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কর্মীর সুরক্ষার অংশ।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য তিন দিনের প্রাক্-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন বা পিডিও প্রশিক্ষণ রয়েছে। কিন্তু তিন দিনে একটি ভাষার মৌলিক দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। ফলে এই প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষাগত ঘাটতি পূরণের আশা বাস্তবসম্মত নয়। নামমাত্র একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি বড় সমস্যাকে সমাধান হয়েছে বলে ধরে নেওয়া বরং আত্মপ্রবঞ্চনা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ৩২টি টিটিসিতে আরবি ভাষার প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁদের দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা নেই। কখনো তাঁদের আরবি শেখাতে বলা হচ্ছে, কখনো অন্য ট্রেডের ক্লাস নিতে বলা হচ্ছে। আবার তাঁদের বাদ দেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে। একটি প্রশিক্ষণব্যবস্থায় এমন অনিশ্চয়তা থাকলে তার সুফল কর্মীরা কীভাবে পাবেন?
এখানে শুধু প্রশিক্ষকদের চাকরির প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র যে অবকাঠামো ও জনবল তৈরি করেছে, সেটিকে কি আমরা পরিকল্পনার অভাবে অকার্যকর হতে দেব?
আরবি ভাষার জন্য পৃথক ট্রেড চালুর বিষয়টি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য এক থেকে তিন মাসের মৌলিক আরবি ভাষা কোর্স চালু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু পেশা ও ভিসার ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীর ভাষাগত দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
জাপানি বা কোরিয়ান ভাষার ক্ষেত্রে আমরা যদি কর্মীদের প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারি, তাহলে আরবি ভাষার ক্ষেত্রে একই যুক্তি প্রযোজ্য হবে না কেন? মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি। সেই বাজারের ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মূলধারায় আনা তাই কোনো বিলাসিতা নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার। আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশকে ‘দক্ষ জনশক্তি’ রপ্তানির দেশ হতে হবে। কিন্তু দক্ষতা কি শুধু ইট-বালু নির্মাণ, বৈদ্যুতিক কাজ, প্লাম্বিং বা যন্ত্র পরিচালনায় সীমাবদ্ধ? যে কর্মী নিজের কাজ জানেন, কিন্তু নিয়োগকর্তার ভাষা বোঝেন না, তিনি পূর্ণাঙ্গ দক্ষ কর্মী কি না—এই প্রশ্নও এখন করা দরকার।
দক্ষ কর্মী মানে শুধু কাজ জানা কর্মী নয়। দক্ষ কর্মী নিজের কাজ বোঝেন, নির্দেশনা বোঝেন, নিজের অধিকার জানেন এবং প্রয়োজনে নিজের পক্ষে কথা বলতে পারেন। ভাষা সেই সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে শুধু বেশি কর্মী পাঠানোর নীতি যথেষ্ট নয়। কর্মীর দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কম মজুরির শ্রমিক পাঠিয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাওয়ার সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করতে হলে কর্মীদের দক্ষ ও ভাষাগতভাবে সক্ষম করে পাঠাতে হবে।
তাই এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত। টিটিসিগুলোতে আরবি ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য স্থায়ী নীতিমালা করতে হবে। প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব নির্ধারণ ও চাকরির কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ভাষা কোর্স চালু করতে হবে। বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও টিটিসিগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী কর্মীদের আমরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ হিসেবে দেখতে পারি না। তাঁরা দেশের অর্থনীতির প্রতিনিধি। তাঁদের ভাষা জানা মানে তাঁদের ক্ষমতায়ন করা। আর তাঁদের ক্ষমতায়ন মানে দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।
মধ্যপ্রাচ্য যদি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস হয়, তাহলে আরবি কেন আমাদের প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান ভাষা হবে না—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দিতে হবে।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com