কিশোর গ্যাং
কিশোর গ্যাং

মতামত

কিশোরেরা কেন পড়াশোনা ছেড়ে অপরাধে জড়াচ্ছে

দরিদ্র পরিবারের মা-বাবা এখন সন্তানের পড়াশোনার পেছনে খরচ করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। কারণ, অনার্স-মাস্টার্স পাস করার পরও এখন চাকরির নিশ্চয়তা নেই। চোখের সামনেই তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, উচ্চতর ডিগ্রিধারী শত শত তরুণ বেকার হয়ে বসে আছেন। এর চেয়ে বরং মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর যদি হাতের কাজ শেখানো যায়, তবে তাতেও কাজের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিংবা বিদেশে পাঠিয়ে দিলেও সন্তান নিজের একটা গতি করতে পারে। এভাবে হঠাৎ করে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া কিশোর-তরুণদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।

এর বিপরীত চিত্রও অবশ্য আছে। কিছু মা-বাবা প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের আশার প্রতিদান দিয়ে সন্তানও ভালো ফলের চেষ্টা করছে। এরপরেও বাংলাদেশের বাস্তবতা এই, প্রথম শ্রেণিতে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়; এরপর প্রতিটি ক্লাসেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে থাকে। এর পেছনে কারণ কী, সেটা সরাসরি জরিপ চালিয়ে হলেও মূল্যায়ন করা জরুরি। এসএসসি পাস করার আগেই কেন একজন অভিভাবক তাঁর মেয়েশিশুর পড়াশোনা ছাড়িয়ে নেন, সেটিও বোঝা দরকার। এগুলো পর্যবেক্ষণে আনলে সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতির একটা খোঁজ পাওয়া যাবে। এর পেছনে দারিদ্র্যের যেমন প্রভাব আছে, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তার অভাবও আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের আগে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা অবৈতনিক করা দরকার। সেটি করা সম্ভব না হলে বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষার্থীর বেতন নির্ধারণ করা যেতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। স্কুলে যাতায়াতের পথে কোনো মেয়েশিক্ষার্থী ইভ টিজিং বা হেনস্তার শিকার হলে সাধারণত সেই মা-বাবা তাঁর সন্তানের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। পরে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন কিংবা মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে স্কুলগুলো আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য সহযোগিতা করতে পারে। সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এ ধরনের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সমস্যা কমবে না।

সন্তান কার সঙ্গে মেশে—এ প্রশ্ন তুলে কিশোরদের অপর অংশকে আমরা শুরুতেই অপরাধী বানিয়ে ফেলছি। অথচ যথাযথ যত্ন ও পদক্ষেপ নিলে প্রত্যেক কিশোরই ইতিবাচক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় হয়ে উঠতে পারে।

যে কিশোর ধীরে ধীরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন কোনো ধরনের ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করতে পারছে না, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। স্কুল-কলেজে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজের পরিসর বাড়াতে হবে এবং এসব কাজে সব শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বিতর্ক, পাঠচক্র, লেখালেখি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ের জন্য ক্লাব দরকার। এসব ক্লাবের উদ্যোগে উৎসব ও মেলার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সহশিক্ষামূলক কাজে যুক্ত রাখতে হবে। যে কিশোরটি দুরন্ত কিংবা সঙ্গদোষে নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে বলে মনে হবে, তাকেই এসব কাজে নেতৃত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে।

এ বয়সের কিশোরদের হাত-পা-শরীর হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। তাদের কণ্ঠস্বরও রুক্ষ হয়ে যায়। বয়ঃসন্ধির প্রভাবে নিজেদের আচরণকেও হয়তো তারা ঠিকমতো সংযত রাখতে পারে না। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই তাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার, মেশা দরকার। সন্তানস্নেহেই তাদের ব্যাপারে যেকোনো পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খেয়াল রাখা দরকার, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়লেই কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তির আওতায় আনা যাবে না; বরং তাকে লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার জন্য কিংবা মনোযোগী করার জন্য পরিবার ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান দেখা যাচ্ছে। রামদা-কিরিচ-হকিস্টিক কিংবা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের মহড়া দিতে দেখা যায়। আবার হয়তো এগুলো নিয়েই তারা টিকটক বানায়। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তাদের ‘আতঙ্ক’ মনে করেন। অল্প বয়সে ক্ষমতার প্রদর্শনে এই কিশোরেরা হয়তো সাময়িক তৃপ্তি পাচ্ছে; হয়তো নিকট ভবিষ্যতে তাদের হাতেই এলাকার সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রণ যাবে। কিন্তু যাদের ছত্রচ্ছায়ায় তারা অপরাধী হয়ে উঠছে, তাদের আগে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। কিশোরদের জন্য সুপথে ফেরার রাস্তা খোলা রেখেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ কারণে কোথাও কিশোর গ্যাং দমনের নামে যেকোনো কিশোরকেই ধরে নিয়ে গেলে হবে না। উঠতি বয়সী একজন কিশোরকে থানায় নিয়ে তার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা দরকার, সেটা পুলিশেরও বোঝা দরকার। কারণ, এই বয়সে তার সঙ্গে চূড়ান্ত অপরাধীর মতো আচরণ করলে তার ভালো পথে ফেরার রাস্তা বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

আমরা ভবিষ্যতের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সেখানে অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু এর বিস্তার দিন দিন বাড়বে—এমনটাও নিশ্চয় আমরা আশা করি না। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময় ও দরিদ্রবান্ধব করতে না পারলে কিশোর অপরাধের প্রবণতা কমবে না। সন্তান কার সঙ্গে মেশে—এ প্রশ্ন তুলে কিশোরদের অপর অংশকে আমরা শুরুতেই অপরাধী বানিয়ে ফেলছি। অথচ যথাযথ যত্ন ও পদক্ষেপ নিলে প্রতিটি কিশোরই ইতিবাচক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় হয়ে উঠতে পারে।

  • তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক