দুবাইয়ের বিলাশবহুল হোটেল বুর্জ আল খলিফার আকাশে আরব আমিরাতের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল
দুবাইয়ের বিলাশবহুল হোটেল বুর্জ আল খলিফার আকাশে আরব আমিরাতের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল

মতামত

ইরান যুদ্ধ: জাঁকজমকের আড়ালে যে ‘সত্য গোপন’ করছে দুবাই

গত মঙ্গলবার দুবাই বন্দরে কুয়েতি তেলবাহী একটি বিশাল ট্যাংকারে ড্রোন হামলার খবর বিশ্বজুড়ে সংবাদে এসেছে। ইরানি ড্রোন থেকে ছোড়া গোলায় যখন ট্যাংকারটিতে আগুন ধরে যায়, তখন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র পরিবেশগত বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ট্যাংকারটি যদি হরমুজ প্রণালিতে ডুবে যেত কিংবা তেল ছড়িয়ে পড়ত, তবে তা এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনত।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং জাহাজে থাকা ২৪ জন ক্রু সদস্য অক্ষত আছেন। বর্তমান আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে একে তেহরানের পক্ষ থেকে অন্যতম বড় একটি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ঘটনার গুরুত্ব ছাপিয়ে আরও একটি বিস্ময়কর বিষয় সামনে এসেছে। দুবাই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং সচল একটি বন্দর হওয়া সত্ত্বেও এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কোনো ভিডিও বা ছবি জনসমক্ষে আসেনি।

বর্তমান স্মার্টফোনের যুগে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার চিত্র নিমেষেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কুয়েতি জাহাজ ‘আল সালমি’র ক্ষেত্রে শুধু দূর থেকে তোলা ধোঁয়া কুণ্ডলীর একটি ঝাপসা ছবি দেখা গিয়েছিল। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ঘটনার অনেক পরে একটি স্থিরচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে আগুন নেভানোর পরবর্তী দৃশ্য দেখা যায়।

দুবাইকে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ঝলমলে ও বিলাসবহুল নগরী। প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দার এই শহরের জীবনযাপন অনেক ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক বা লাস ভেগাসকেও হার মানায়। নামীদামি ইনফ্লুয়েন্সাররা দিনরাত যে শহরের বিজ্ঞাপন প্রচার করেন, সেই উম্মুক্ত শহরে এমন খবর সেন্সর করা বা গণমাধ্যমের ‘ব্ল্যাকআউট’ রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

বাস্তবতা হলো ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের কঠোর প্রশাসনিক অবয়ব উন্মোচন করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার কোনো ছবি কিংবা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে জেল ও মোটা অঙ্কের জরিমানার ভয় দেখানো হচ্ছে। দুবাইয়ের যে ইনফ্লুয়েন্সাররা শহরটিকে ‘বিশ্বের নিরাপদতম স্থান’ হিসেবে প্রচার করেন, তাঁদের সেই উজ্জ্বল প্রচারণার আড়ালে এখন হাজার হাজার বিদেশি বাসিন্দার আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা চাপা পড়ে আছে।

দুবাইয়ের একটি বন্দরে ইরানের হামলা।

আইনি কড়াকড়ির নজির পাওয়া যায় গত ১২ মার্চ দুবাইয়ের ক্রিক হারবার এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন আঘাত হানার ঘটনায়। তখন মাত্র তিনজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের নিজেদের অবস্থা জানাতে ছবি পাঠিয়েছিলেন। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে তাঁদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়। দেশটিতে বলবৎ থাকা সাইবার অপরাধ আইনে এমন অপরাধে ২০ হাজার থেকে ২ লাখ দিরহাম জরিমানা ও ২ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে।

বেসরকারি আইনি সহায়তা সংস্থা ‘ডিটেইনড ইন দুবাই’-এর প্রধান রাধা স্টার্লিং জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির পর থেকে এ আইনে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ফোন তল্লাশি করছেন। সাধারণ গৃহকর্মী থেকে শুরু করে ধনাঢ্য বিনিয়োগকারী—কেউই এই নজরদারি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

দুবাইয়ের লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সাররা যুদ্ধের শুরুতে সাময়িকভাবে বিচলিত হয়েছিলেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা আবার প্রশাসনিক প্রশংসা আর সুখের কৃত্রিম গল্প বলতে শুরু করেছেন, যেখানে ড্রোন হামলা কিংবা সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে কথা বলা একেবারে নিষিদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে, দুবাইয়ের এই কৃত্রিম ভাবমূর্তি আর কত দিন বজায় থাকবে?

দুবাইয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসি এই কড়াকড়ির পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে জনমনে আতঙ্ক না ছড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের কাজে কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে? গণমাধ্যম অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট বা সিপিজে জানাচ্ছে, দুবাইয়ে কর্মরত অনেক প্রতিবেদক গোপনে জানিয়েছেন, তাদের ওপর কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তথ্য বাইরে না দিতে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দুবাই মূলত একটি নিপুণভাবে সাজানো নাটকের মঞ্চের মতো। এখানে বাইরের জাঁকজমকের আড়ালে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিক শোষণের খবর সচরাচর বের হতে দেওয়া হয় না। সিরিয়া, গাজা বা ইয়েমেনের কান্নার শব্দ যাতে এখানকার বিলাসবহুল জীবনে ব্যাঘাত না ঘটায়, সে জন্য প্রশাসন সর্বদা সজাগ। এমনকি সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাতের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ উঠলেও দেশটি সব সময় তা অস্বীকার করে নিজেদের বিনিয়োগবান্ধব স্বর্গ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, দুবাইয়ের লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সাররা যুদ্ধের শুরুতে সাময়িকভাবে বিচলিত হয়েছিলেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা আবার প্রশাসনিক প্রশংসা আর সুখের কৃত্রিম গল্প বলতে শুরু করেছেন, যেখানে ড্রোন হামলা কিংবা সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে কথা বলা একেবারে নিষিদ্ধ।

প্রশ্ন উঠেছে, দুবাইয়ের এই কৃত্রিম ভাবমূর্তি আর কত দিন বজায় থাকবে? মানুষ মূলত নিরাপত্তার কারণেই দুবাইয়ে বসবাস ও বিনিয়োগ করে। কিন্তু প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে একের পর এক ড্রোন হামলা সেই নিরাপত্তার মিথটি ভেঙে দিচ্ছে। যাঁরা এখানে নিয়মিত বসবাস করেন, তাঁরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আড়াল করতে মাঝেমধ্যে ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক করলেও পর্দার আড়ালে ভয়ের সংস্কৃতি প্রবল হচ্ছে।

২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা কিংবা ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা সফলভাবে কাটিয়ে উঠলেও এবারের চ্যালেঞ্জটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তথ্য সেন্সরশিপ এবং অহেতুক ধরপাকড় দেশটির দীর্ঘ লালিত ‘স্বাধীন ও উদার’ ইমেজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত, কিন্তু কণ্ঠরোধ করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না।

  • চার্লি ক্যাম্পবেল টাইম ম্যাগাজিনের এডিটর অ্যাট লার্জ

টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত