
দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক টিকাদান কর্মসূচি ও নিবিড় তদারকির ফলে বিশ্বজুড়ে হাম নিয়ন্ত্রণে একটি স্বস্তিদায়ক সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে নতুন করে এর প্রাদুর্ভাব এবং বেশ কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের আবার এক গভীর উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সরকার এরই মধ্যে টিকাদানের বয়সসীমা কমিয়ে ৬ মাস করা বা বিশেষ ক্যাম্পেইনের মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তবু সাধারণ মানুষের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, টিকা দেওয়া সত্ত্বেও শিশুরা কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে? তবে কি আমাদের কষ্টার্জিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে?
মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার আলোকে এ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর নেপথ্যে কেবল ভাইরাসের নতুন কোনো রূপ বা রূপান্তর (মিউটেশন) দায়ী নয়। গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের কারণে টিকা অকার্যকর হচ্ছে না; বরং আসল সংকট লুকিয়ে রয়েছে শিশুর শরীরের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষার শূন্যতা, চরম অপুষ্টি, চিকিৎসায় বিলম্ব, করোনাকালের ধাক্কা এবং সবচেয়ে ভয়াবহ—অ্যাডিনো ভাইরাসের দ্বৈত সংক্রমণের মধ্যে।
টিকা দেওয়ার পরও রোগে আক্রান্ত হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রেকথ্রু ইনফেকশন’ বা টিকা ব্যর্থতা বলা হয়। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর প্রায় ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। কোল্ড চেইনের মাধ্যমে টিকার সঠিক তাপমাত্রা বজায় না থাকা কিংবা টিকা দেওয়ার সময় শিশুর শরীরে আগের অ্যান্টিবডির উপস্থিতি এর অন্যতম কারণ।
তবে মূল বৈজ্ঞানিক সংকটটি লুকিয়ে আছে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষার শূন্যতায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাকালের এক নীরব ধাক্কা। ২০২০-২০২২ সালের মহামারিকালে লকডাউনের কারণে যেসব কিশোরী ও তরুণী টিকা নেওয়া থেকে বাদ পড়েছিলেন, তাঁরা এখন মা হচ্ছেন। একজন মা টিকা না পেয়ে থাকলে বা অতীতে হামে আক্রান্ত না হলে গর্ভাবস্থায় ফুল বা প্লাসেন্টার মাধ্যমে নবজাতকের শরীরে যে প্রাথমিক সুরক্ষা অ্যান্টিবডি যাওয়ার কথা, তা শিশুটি পায় না।
সাধারণত গর্ভকালীন মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে শুরুর ৩ থেকে ৫ মাস কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ মাস বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাত্র ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ শিশুর শরীরে এই সুরক্ষা অবশিষ্ট থাকে। এত দিন দেশে প্রথম টিকা দেওয়া হতো ৯ মাস বয়সে। ফলে শিশুটি এক দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকত। মহামারিতে টিকা না পাওয়া মায়েদের নবজাতকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি জীবনের প্রথম দিন থেকেই তৈরি হচ্ছে। সরকার টিকাদানের বয়স কমিয়ে ৬ মাস করায় এই শূন্যতা পূরণের পথ কিছুটা সহজ হয়েছে।
হাম আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা ও মৃত্যুর হার বাড়ার পেছনে বড় কারণ ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বা রোগপ্রতিরোধ স্মৃতির অবলুপ্তি। হামের ভাইরাস শিশুর প্রতিরোধব্যবস্থার স্মৃতিকোষের (মেমোরি সেল) প্রায় ৭৩ শতাংশ ধ্বংস করে দেয়। ফলে শিশুটি হাম থেকে সাময়িক সুস্থ হলেও তার ইমিউন সিস্টেম এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে পরবর্তী কয়েক মাস যেকোনো সাধারণ সংক্রমণেও শিশুটির প্রাণহানি ঘটতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের অপুষ্টি। অপুষ্ট শিশুদের শরীরে টিকা দিলেও পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সাড়া তৈরি হয় না। এ ছাড়া হাম শরীরের সঞ্চিত ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। এতে কেবল দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিই তৈরি হয় না, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও হাসপাতালে না এনে বাড়িতে চিকিৎসায় দেরি করাও অকালমৃত্যুর বড় কারণ।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিকটি হলো অ্যাডিনো ভাইরাসের দ্বৈত সংক্রমণ (কো-ইনফেকশন)। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সংকটাপন্ন হাম রোগীদের একটি বড় অংশে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
হামের কারণে যখন শিশুর প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেই সুযোগে অ্যাডিনো ভাইরাস ফুসফুসে ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। সাধারণ অবস্থায় অ্যাডিনো ভাইরাস মৃদু সর্দি-জ্বর তৈরি করলেও হামের সঙ্গে যৌথ আক্রমণে তা ফুসফুসের অক্সিজেন শোষণের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এক্স-রে রিপোর্টে ফুসফুস তখন তুষারশুভ্র বা ‘হোয়াইট লাংক’ রূপ ধারণ করে এবং দ্রুত শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।
হাম কেবল একটি ভাইরাসের আক্রমণ নয়; এটি অপুষ্টি, অনাক্রম্যতার দুর্বলতা এবং দ্বিতীয় ভাইরাসের যৌথ আক্রমণের ফল। এই জীবনঘাতী চক্র থেকে শিশুদের রক্ষা করতে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
ভিটামিন ‘এ’ ও পুষ্টি–সহায়তা: হামের লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান এবং অপুষ্ট শিশুদের বিশেষ পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন: যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম বা অপুষ্টি বেশি, সেখানে বাদ পড়া শিশু ও নারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সম্পূরক টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।
দ্রুত চিকিৎসা ও আলাদা রাখা: জ্বর ও ফুসকুড়ি (র্যাশ) দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে হবে যাতে অন্য শিশুরা সংক্রমিত না হয়।
মায়ের সুরক্ষা পরীক্ষা: সন্তান নেওয়ার আগেই নারীদের শরীরে অ্যান্টিবডি আছে কি না, তা নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়া তরুণীদের হামের টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
গবেষণা ও ট্রায়াল: ছয় বা সাত মাস বয়সে প্রথম ডোজ টিকা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে এবং অপুষ্ট শিশুদের বাড়তি কোনো বুস্টার ডোজ লাগবে কি না, সে বিষয়ে নিজস্ব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে।
হাম সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। কেবল ভাইরাসের ওপর দায় না চাপিয়ে অনাক্রম্যতার শূন্যতা পূরণ, অপুষ্টি দূরীকরণ, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই পারে আমাদের শিশুদের অকালমৃত্যু রোধ করতে।
আনোয়ার খসরু পারভেজ অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ই–মেইল: khasru73@juniv.edu