নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনে সশস্ত্র বাহিনী সংজ্ঞাভুক্ত থাকলে তিন বাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের দরকার হয় না। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পান।
এমনিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘর্ষ-সংঘাত তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রায়ই পুলিশ এসব সামাল দিতে পারে না। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচনে কারচুপি ও সহিংসতা কম হবে বলে জনমনে একটা বিশ্বাস আছে। ইসির সাম্প্রতিক বক্তব্যে তারই প্রতিফলন দেখা যায়।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। এটি একটি বড় দল। দলটি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নাড়াচাড়া করলে প্রশাসনে অস্বস্তি বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দলের সমর্থকেরা খুবই তৎপর। কিছুদিন আগে তাঁরা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিলে সরকার অতিপ্রতিক্রিয়া দেখায়। সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়। তার মানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে তাঁরা সরকারকে কিছুটা আতঙ্কে ফেলতে পেরেছিলেন। যদিও আসলে তেমন কিছু হয়নি।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দাবি জানিয়েছে ‘সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীকে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার বিধান সংযোজন’ করতে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া নিয়ে দলটি ৩০ জুন ইসিতে যে মতামত দিয়েছে, সেখানে এ দাবি জানানো হয়। যদিও এ দাবির সঙ্গে আচরণবিধির কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই।
আবার ইসি–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যাচ্ছে, জামায়াতের এ দাবি পূরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতা-সম্পর্কিত যেসব ধারা আছে, সেখানে সংশোধনী আনতে হবে। তবে এমন কিছু যুক্ত করার কোনো চিন্তা এখন পর্যন্ত ইসির নেই। (প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০২৬)
আওয়ামী লীগ যে একটি অতি খারাপ দল, এটি যে জনগণ ও দেশের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, দেশকে দেউলিয়া করে দিয়েছে, এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্বটা ভোটারের হাতেই ছেড়ে দিন না? আওয়ামী লীগ করা লোকেরা যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট না পান কিংবা খুব কম ভোট পান, তাহলে তো আমরা বলতে পারব, দেশের মানুষ দলটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি করতে অসুবিধা কোথায়?
আবহমানকাল ধরে দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে আসছে নির্দলীয় ভিত্তিতে। নির্বাচনের প্রার্থীরা অনেকেই দল করেন। এটা কোনো লুকোছাপা ব্যাপার নয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা তাঁদের প্রচারে-পোস্টারে দলের নাম বা প্রতীক ব্যবহার করেন না।
দেখা গেছে, একই দলের একাধিক প্রার্থী একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যাঁর ক্ষমতা বা প্রভাব বেশি অথবা যিনি বেশি জনপ্রিয়, তিনি জয়ী হচ্ছেন। এভাবেই চলে আসছিল। শেখ হাসিনার সরকারের মাথায় কী বুদ্ধি চাপল, তারা এ ব্যবস্থা পাল্টে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করল। যুক্তি হিসেবে বলল, বাংলাদেশ তো ব্যতিক্রম নয়, অমুক অমুক দেশে তো এ রকম ব্যবস্থা আছে।
তারা উদাহরণ টানল যুক্তরাজ্যের। ভালো কথা। তারা কি যুক্তরাজ্যকে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার মডেল মনে করে? সেখানে নির্বাচনে খারাপ ফল করলে কিংবা হেরে গেলে তো সংসদ নেতা বা দলীয় প্রধান পদত্যাগ করেন। নতুন নেতৃত্ব আসে। আমাদের নেতারা কি সেটি অনুসরণ করেন? মোটেই না। এখানে একবার দলের বা সরকারের চূড়ায় উঠতে পারলে মৃত্যু ছাড়া তাঁকে আর কেউ সেখান থেকে নামাতে পারবে না।
কোনো একটা ব্যবস্থায় যখন ফায়দা পাওয়া যায়, তখন তাঁরা সেটির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। আর যদি দেখেন তাঁদের অসুবিধা হয়, নেতৃত্ব নিয়ে টানাটানি পড়ে, তাহলে তাঁরা ওই ব্যবস্থার ছায়াও মাড়ান না। এটা হচ্ছে চরম সুবিধাবাদ।
যাহোক, দেশে মোটামুটি একটা রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে যে পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। এখন শুধু আইন তৈরির অপেক্ষা। তো এই পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর দাবির যৌক্তিকতা কী? নির্বাচন দলগতভাবে না হলে কী করে বলেন যে অমুক দলের লোকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে হবে?
কিছু কিছু দলের মাথায় এটা ঢুকে গেছে যে নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হলে এটাকে উপলক্ষ করে আওয়ামী লীগের লোকেরা মাঠে নামার সুযোগ পাবেন এবং মাঠ গরম করে ফেলবেন। দুই কারণে এর বিরোধিতা হতে পারে। এক. আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিস্ট দল। ক্ষমতায় থেকে তারা অনেক অনাচার আর কুকর্ম করেছে। সুতরাং তাদের আর কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না।
দুই. অতীতে আওয়ামী লীগ করেছেন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন চুপচাপ বা গ্রেপ্তার-হয়রানির ভয়ে আত্মগোপনে আছেন, এ সুযোগে তাঁরা স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে নির্বাচনে জিতে যেতে পারেন। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন হবে।
যাঁরা অন্যায়-অপরাধ করেছেন, তাঁদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া যায়। এটি গ্রহণযোগ্য। এ রকম অপরাধীর সংখ্যা কত? এর বাইরেও তো আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী-সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন। তাঁদের সংখ্যা কত?
আমরা যদি ২০০৮ সালের বিশেষ ব্যবস্থাধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে হিসাবে না-ও ধরি এবং ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত অপেক্ষাকৃত অধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনগুলোকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আওয়ামী লীগের ভোট তো মোট ভোটারের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। সংখ্যাটি তো এখন তিন-চার কোটি হবে।
ধরে নিলাম, ১৫ বছর নির্বাচন ম্যানিপুলেট করে, দুঃশাসন চালিয়ে দলটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। কতটুকু হারিয়েছে, সেটি তো কোনো জরিপ ছাড়া হিসাব করা সম্ভব নয়। যদি ধরে নিই, আওয়ামী লীগের ওপর বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার ভোটার অর্ধেক কমে গেছে, তাহলেও দেড়-দুই কোটি সমর্থক আছে দলটির।
আওয়ামী লীগ যে একটি অতি খারাপ দল, এটি যে জনগণ ও দেশের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, দেশকে দেউলিয়া করে দিয়েছে, এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্বটা ভোটারের হাতেই ছেড়ে দিন না? আওয়ামী লীগ করা লোকেরা যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট না পান কিংবা খুব কম ভোট পান, তাহলে তো আমরা বলতে পারব, দেশের মানুষ দলটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি করতে অসুবিধা কোথায়?
যাঁদের গায়ে আওয়ামী লীগের গন্ধ আছে, তাঁদের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনের বাইরে রাখার পেছনে আর কী যুক্তি থাকতে পারে, যদি না তাঁদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়? জামায়াতে ইসলামীর কি নিজের শক্তি-সামর্থ্যের ওপর আস্থা নেই? তারা কি মনে করে যে আওয়ামী লীগ তাদের চেয়ে এখনো বেশি জনপ্রিয় এবং ভোটে দাঁড়ালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়াতে ভয় পায়?
আমি সব সময় বলে আসছি, যাঁরা ১৯৪৭ সালে অখণ্ড ভারত চেয়েছিলেন কিংবা মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান হোক এটি চাননি, এটি ছিল তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান। এ অবস্থান নেওয়াটা অপরাধ ছিল না। আবার যাঁরা চেয়েছিলেন পাকিস্তান অখণ্ড থাকুক, তাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এটা ছিল তাঁদের রাজনীতি। এ রকম রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়াটাও অপরাধ নয়।
অপরাধ ছিল একাত্তরের নৃশংসতার পক্ষ ও সহযোগী হওয়া, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়ানো। একইভাবে আমি মনে করি, কয়েক কোটি নাগরিক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থন করে কোনো অপরাধ করেননি। যাঁরা নির্বাচনে কারচুপি, ভোট ডাকাতি, লুটপাট, হত্যা, গুম, প্রতিপক্ষ দলের লোকদের পেটানো, তাঁদের ঘরছাড়া করা—এসব অপরাধে জড়িত ছিলেন, ধরে ধরে তাঁদের বিচারের আওতায় আনা হোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। সেটি তো দেখছি না। মনে হচ্ছে, কিছু ‘কসমেটিক’ বিচার করে রাজনীতি চলবে। এটি হবে আরেক ধরনের প্রতারণা।
দেশটা কোনো দলের নয়। দেশটা ১৭-১৮ কোটি মানুষের। সব দলেই কমবেশি চোর, গুন্ডা, বদমাশ, চাঁদাবাজ, লুটেরা ও খুনি আছে। সমস্যা হলো, কোনো একটা লড়াইয়ে যখন এক পক্ষ জিতে যায়, তখন সেই পক্ষ নিজেদের সবাইকে ধোয়া তুলসী পাতা মনে করে আর পরাজিত পক্ষকে মনে করে সব নষ্টের মূল কারণ। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই এ ধারা চলে আসছে। ফলে কোনোভাবেই ‘পলিটিক্যাল রিকনসিলিয়েশন’-এর সংস্কৃতিটা চালু করা যায়নি। ইতিহাস আমাদের বারবার সুযোগ দিয়েছে। আমরা জাতিগতভাবে সে সুযোগ হেলায় হারিয়েছি, নিজেদের নির্বুদ্ধিতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা কিংবা বদমতলবের কারণে। এ ধারা চলবে কত দিন?
● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
[ ২৪ জুলাই ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকায় ‘পলিটিক্যাল রিকনসিলিয়েশন’ সংস্কৃতিটা চালু হোক’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]