নাগরিকের জীবনমান উন্নয়ন ও নাগরিক সুযোগ–সুবিধার নিশ্চিয়তা সহ একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্যারিশমাটিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার পর থেকে এর অভাব আমরা অনুধাবন করছি। উন্নয়নের একটি গ্রহণযোগ্য শিখরে পৌঁছাতে না পারলেও বিগত কয়েক দশকজুড়ে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা থেকে বের হতে পেরেছে।
নানা সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা যেমন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে নানাভাবে ব্যাহত করেছে, তেমনি উন্নয়নযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বারবার আমরা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় পর্যবসিত হয়েছি। এখানে ক্রমান্বয়ে একটি অভিজাত ও শোষণমূলক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থায় দেশের বিশেষ কিছু গোষ্ঠীই বিধিবহির্ভূতভাবে লাভবান হয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকাই যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দো যে প্রপঞ্চকে সামাজিক পুঁজি বলে আখ্যায়িত করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ থাকলেও আমাদের তরুণ এবং সুশীল সমাজ থেকে উঠে আসা উপদেষ্টারা তা অর্জন করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হন। এটা ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের সংকটকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব ও একটি স্থিতিশীল এবং কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভাবই যে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়, সেটি আমরা বিগত সময়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। যখনই আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল, আমাদের উন্নয়নের চিত্র ইতিবাচক ছিল। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রা থেকে আমরা এটা অনুধাবন করেছি, যা চলমান ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরও।
কিন্তু উন্নয়নের সেই ইতিবাচক প্রবণতা নষ্ট হতে শুরু হয় যখন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ফলে আমরা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সেই নেতৃত্বের অভাব উপলব্ধি করি এবং আবারও একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় আমাদের পড়তে হয়।
আগামী দিনগুলো বিএনপি সরকারের জন্য কেমন হবে, সেটি নির্ভর করবে তারা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। এখানেই রয়েছে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের বিষয়। এর মাধ্যমে জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা এবং আস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন স্বভাবতই জনমনে এক বিশাল প্রত্যাশা তৈরি করে। বিএনপি সরকারের তিন মাসের বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে পেছন ফিরে তাকালে অনেক ইতিবাচক বদল আমরা দেখতে পাই, যা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন লেখালেখির মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের সামনে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় রয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মূল্যায়ন যদি করতে হয়, তাহলে বিএনপি সরকারের কার্যক্রমের সাধুবাদ তারা পেতেই পারে, যদিও তিন মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়।
তবে আগামী দিনগুলো বিএনপি সরকারের জন্য কেমন হবে, সেটি নির্ভর করবে তারা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। এখানেই রয়েছে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের বিষয়। এর মাধ্যমে জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা এবং আস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বিগত সময়ে জনগণের সঙ্গে সরকারের আস্থার সম্পর্ক না থাকার ফলে জনগণের মধ্যে একধরনের ভয় ও বিশ্বাসহীনতা গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শোষণমূলক ব্যবস্থা যেন আবারও গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে।
যেহেতু আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, সেহেতু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে তার পিতা-মাতার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যের আলোকে মূল্যায়ন করার একটি প্রবণতা কাজ করে। কেউ কেউ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের তুলনামূলক বিশ্লেষণও করতে চান। যদিও একই পরিবারের হলেও দুজন নেতার নেতৃত্বের গুণাবলি এক রকম না-ও হতে পারে।
’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের সংকট মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের মধ্যে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের ওয়েবেরিয়ান ধারণার ছোঁয়া যেমন ছিল, তেমনি জেমস বার্নসের রূপান্তরমূলক নেতৃত্বের ধারণাও ছিল। ফলে জিয়াউর রহমান খুবই অল্প সময়ে একজন জনবান্ধব নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের সংকট মোকাবিলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনেও রয়েছে এমন সুযোগ। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে সংকটকালীন পরিস্থিতিই ক্যারিশমাটিক নেতা হয়ে ওঠার সহায়ক পরিবেশ হিসেবে কাজ করে।
সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ জীবনাচরণ এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ আচরণ একধরনের কৌতূহল ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জনতুষ্টিমূলক কার্যক্রম যেমন, যানজটের শহরে একই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চলাচল, ধর্ষণ ও হত্যার সঠিক বিচারের প্রতিশ্রুতি, ঈদের পর শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয়গুলো জনমনে ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে এসেছে। কিন্তু দেশকে বদলে দেওয়ার সেই ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে হলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর টেকসই ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপই যদি সমস্যা সমাধানের একটি চর্চা হয়ে ওঠে, সেটি আদতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করবে। ব্যক্তিক ক্যারিশমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে মানুষের জীবনে ইতিবাচক বদল নিয়ে আসার টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বেশি নজর দেওয়া জরুরি।
তাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও মব-সন্ত্রাসের মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে দমন করার টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে অসহিষ্ণু পরিস্থিতি আমরা দেখেছি, সেটা সামাল দিতে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। এখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে মাজারে হামলা, চলচ্চিত্র প্রচারে বাধা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা অধরাই থেকে যাবে।
পাশাপাশি, উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। বিগত সময়ের মেগা প্রজেক্টের রাজনীতিতে এটা অনুপস্থিত ছিল।
এ বিষয়গুলো আমাদের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতার অভাবকে তুলে ধরে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান আমাদের সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে প্রত্যাশা সমাজে রয়েছে, তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ক্যারিশমাটিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যা আমাদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এমন একটি স্থিতিশীল দেশে পরিণত করবে।
বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব