বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; বরং নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
ফলে খেলাপি ঋণ এখন শুধু একটি ব্যাংকিং সমস্যা নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমাতে এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নতুন মেকানিজম ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি নিয়ে এসেছে।
সময়ই বলবে, এই উদ্যোগ খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ২১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৫৭ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
একই সময়ে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের (ডিসট্রেসড অ্যাসেট) পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ দশমিক ৯২ লাখ কোটি টাকা; অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই বিপুল সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ, পুনঃ তফসিলকৃত ঋণ, অবলোপনকৃত ঋণ এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ; অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত কোনো আয় সৃষ্টি করছে না, অথচ এর বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। ফলে মুনাফা কমছে, মূলধনের ওপর চাপ বাড়ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি কেন প্রয়োজন
খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে পুনঃ তফসিল (রি–শিডিউলিং) ব্যবস্থা একটি স্বীকৃত পন্থা হলেও এটি ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশেষ নীতিগত সহায়তার আওতায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়। এই ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ আবারও খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নতুন ম্যাকানিজম ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি নিয়ে এসেছে। ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটির নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত মেনে গ্রাহকেরা চাইলে তাদের ঋণের পুরো মূল অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করে এক্সিট নিতে পারবে। এই ফ্যাসিলিটিকে আরও ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এই সার্কুলারে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ঋণ গ্রাহকদের আরোপিত ও অনারোপিত উভয় ধরনের সুদ মওকুফের ক্ষমতা প্রদান করেছে।
এর ফলে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে তহবিল খরচ (কস্ট অব ফান্ড) আদায় নিশ্চিত করার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা শিথিল করা হলো। তবে মূলধন মওকুফের সুযোগ নেই এই ব্যবস্থায়।
এই সুবিধা সব খেলাপি ঋণগ্রহীতার জন্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ (ফান্ড ডাইভার্সন) বা অন্যান্য অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ঋণ এই সুবিধার আওতায় আসবে না, অর্থাৎ এটি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য নয়; বরং প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া এবং সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে আগ্রহী—এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি পুনরুদ্ধারমূলক ব্যবস্থা।
কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটির সুযোগ গ্রহণ করলে আরোপিত ও অনারোপিত সুদ সম্পূর্ণ ও আংশিক মওকুফের সুবিধা পেতে পারে। আরোপিত সুদ বলতে সাধারণত সেই সুদকে বোঝায়, যা ঋণ হিসাবে চার্জ করা হয়েছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আদায় না হওয়ায় ইন্টারেস্ট সাসপেন্সে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর অনারোপিত সুদ হলো সেই সুদ, যা খেলাপি হওয়ার পর আর গ্রাহকের ঋণ হিসাবে চার্জই করা হয়নি, তবে ঋণ অ্যাকাউন্টটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আলাদাভাবে ‘স্থগিত সুদ’ হিসাবে জমা রাখা হয়। যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের পর পেমেন্ট দেওয়া বন্ধ করে দেন, তখন সেই ঋণ নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) বা খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ব্যাংককে তখন এই ঋণের অনাদায়ি সুদকে লাভ-ক্ষতির হিসাবে নেওয়ার পরিবর্তে একটি ‘স্থগিত সুদ’ হিসাবে জমা রাখতে হয়।
ব্যাংকের মুনাফার ওপর সুদ মওকুফের প্রভাব
এই ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটির আরোপিত ও অনারোপিত যে সুদ মওকুফের কথা বলা হয়েছে, তা একটি ‘স্থগিত সুদ হিসাবে’ জমা রাখা হয়। এই হিসাবে রক্ষিত সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের মুনাফার ওপর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ, এই সুদ এখনো ব্যাংকের মুনাফায় নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর বার্তা
ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি কেবল একটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহত্তর সংস্কার উদ্যোগের একটি অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
যেসব ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি, তাদের ছয় মাসের মধ্যে তা ২০ শতাংশের নিচে নামানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে, তাদের তা ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ প্রস্তাবিত ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (ডিএএমসি) কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এটি ব্যাংকগুলোর জন্য যেমন একটি সতর্কবার্তা, তেমনি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন সংস্কার দর্শনের সূচনা।
ব্যাংকের জন্য কী সুফল বয়ে আনতে পারে
এ ধরনের নগদ অর্থ পুনরুদ্ধার ব্যাংকের জন্য বহুমুখী সুফল বয়ে আনতে পারে। খেলাপি ঋণ কমলে প্রভিশনের চাপ কমবে, ভবিষ্যতে প্রভিশন রাইট ব্যাকের মাধ্যমে মুনাফা ও মূলধন শক্তিশালী হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা সম্পদ পুনরুদ্ধার হলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট আরও পরিচ্ছন্ন হবে, তারল্য বাড়বে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতির ওপর।
ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটির পাশাপাশি ডিএএমইউ এবং ডিএএমসি কেন প্রয়োজন?
খেলাপি ঋণের এমন বাস্তবতায় ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি একাই বাংলাদেশের বিপুল খেলাপি ঋণসমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কারণ, সব খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সুবিধা গ্রহণের অবস্থায় নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক জামানত দীর্ঘদিন ধরে আদালতের জটিলতায় আটকে আছে, আবার অনেক ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে সমঝোতাভিত্তিক নিষ্পত্তির পরিবর্তে প্রয়োজন একটি বিশেষায়িত ও পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো।
ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন, ২০২৬ আইন অনুযায়ী ডিএএমইউ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। ডিএএমইউ নিজে কোনো খেলাপি ঋণ কিনবে না; বরং এটি হবে একটি লাইসেন্সিং, নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষ। যারা দেশে একটি কার্যকর ডিসট্রেসড অ্যাসেট মার্কেট গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
ডিএএমইউর অনুমোদন নিয়ে বেসরকারি ডিএএমসি খেলাপি ঋণ ব্যাংক থেকে কিনবে এবং সেগুলো পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন, পুনঃ তফসিল, জামানত ব্যবস্থাপনা কিংবা বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির মাধ্যমে মূল্য উদ্ধার করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি
ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হলেও এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি রয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো নৈতিক ঝুঁকি (মোরাল হ্যাজার্ড)।
যদি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকেরা মনে করেন যে খেলাপিরা শেষ পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে সৎ ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হবেন এবং কিছু গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ বিলম্বিত করার প্রবণতা দেখাতে পারেন।
কাঠামোগত সমন্বিত সংস্কার অপরিহার্য
ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদে কিছু সুফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
প্রথমত, ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্য নির্ধারণ (রিস্ক বেজড প্রাইসিং) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের যথাযথ মূল্য নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়ত, আইএফআরএস৯ অনুযায়ী এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লসভিত্তিক (ইসিএল) প্রভিশনিং বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঋণের ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, রিস্ক বেজড সুপারভিশনের (আরবিএস) মাধ্যমে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজাল, ক্রেডিট মনিটরিং, উন্নত করপোরেট গভর্ন্যান্স, জবাবদিহিমূলক পরিচালনা পর্ষদ এবং রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অযাচিত প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত বাস্তবায়ন দরকার
পরিশেষে বলা যায়, ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি খেলাপি ঋণ সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়; তবে এটি একটি বাস্তবসম্মত পুনরুদ্ধার কৌশল। আর ডিএএমইউ এবং ডিএএমসির মতো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সঙ্গে এটিকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান উন্নত হবে, নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি অধিকতর স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই ভিত্তির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
তোফায়েল করিম খান সিইআরএম, সিপিসি ঋণ পরিচালনা বিভাগ, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি।