
এক দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে ইরানের আঞ্চলিক কৌশল ছিল একটি সহজ প্রশ্নের বাস্তববাদী উত্তর। তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—সরাসরি এমন যুদ্ধে না জড়িয়ে কীভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা চাপকে প্রতিহত করা যায়। এর উত্তরে ইরান অংশীদার গড়ে তুলেছে এবং উত্তেজনা বাড়ানো বা না বাড়ানোর বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখেছে।
তবে সেই কৌশল এখন ক্ষতিগ্রস্ত। যেসব উপায়ের মাধ্যমে ইরান সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলত, টানা দুই বছর একের পর এক ধাক্কা সেগুলোকেও দুর্বল করেছে। এ নতুন বাস্তবতায় ইরানের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত স্বল্পমেয়াদি পথ চরমপন্থা নয়; বরং দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ এমন এক কৌশল, যেখানে একটি যৌথ হুমকি মোকাবিলার খরচ অন্যদের বহন করতে দেওয়া হয়, যারা নিজেদের কারণেই ক্রমে ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে।
দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মানে নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত, যেখানে কেউ নিজে প্রধান প্রতিরোধকারী না হয়ে ধরে নেয় যে অন্যরা সামনে থেকে সেই দায়িত্ব বহন করবে। এ দায় শুধু সামরিক সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। তা হতে পারে কূটনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া, চাপ সৃষ্টির সংকেত দেওয়া, আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা রাজনৈতিক ঝুঁকি বহন করা। যুক্তিটা সহজ। যখন কৌশলগত পরিবেশ এমনভাবে বদলায় যে অন্যদের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রণোদনা বেড়ে যায়, তখন নিজের শক্তি ও সম্পদ সংরক্ষণ করাই হয়ে ওঠে যুক্তিসংগত।
এ যুক্তি তেহরানের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে তিনটি বড় ঘটনা কাজ করেছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হন, যা ইরানের প্রতিরোধকাঠামোর জন্য বাস্তব ও প্রতীকী দুই দিক থেকেই বড় আঘাত ছিল।
দ্বিতীয়ত, হিজবুল্লাহর দুর্বলতা, আস্তানাকাঠামোর ক্ষয় এবং বদলে যাওয়া আঞ্চলিক সমীকরণের মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরীয় বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখল করে নেন। ফলে বাসার আল–আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং আহমেদ আল শারার সঙ্গে যুক্ত নতুন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ খুলে যায়।
তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা ১২ দিনের সরাসরি যুদ্ধ হয়, যা ২৪ জুন একটি যুদ্ধবিরতিতে গিয়ে থামে। এ সংঘাতে ১৩ জুন থেকে ইসরায়েলের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাত ছিল। এসব ঘটনা ইরানকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেয়নি।
তবে এগুলো তেহরানের সেই সক্ষমতা স্পষ্টভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা আরেকটি সরাসরি মোকাবিলার ধাক্কা সামাল দিতে পারত। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর ফলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং সিরিয়ায় ইরানের অবস্থান যে ধাক্কা খেয়েছে, তা ইরানের পরোক্ষ প্রভাবের হাতিয়ারগুলোকে দুর্বল করেছে। ঠিক সেই সময়ই ২০২৫ সালের যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, সরাসরি সংঘাতে জড়ালে কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ইরানের এখন মূল লক্ষ্য সময় কেনা। নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক ঠিক করা এবং উত্তেজনার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করার জন্য সময়, যাতে এ সময়টায় অন্যরা সংঘাতের খরচ বহন করে।
দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি ক্ষেত্র গড়ে উঠছে লোহিত সাগর, বাব আল মান্দাব ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলজুড়ে, যেখানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ্য ভাঙন তৈরি করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিষয়ে সৌদি আরব কড়া বার্তা দেয়।
এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উল্টো চিত্র সামনে আসে। বহু বছর ধরে ইরানই মূলত ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার খরচ বহন করেছে, আর সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সেই চাপ নিজের কাঁধে না নিয়েই সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে, যেখানে এই দেশগুলোকেই ইসরায়েলের বিস্তারমুখী নীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে আঙ্কারা বা রিয়াদ ইরানের পক্ষে চলে গেছে; বরং তাদের হুমকি উপলব্ধি এমনভাবে বদলাচ্ছে, যা ইরানের ওপর থাকা চাপ কিছুটা হলেও কমিয়ে দিচ্ছে।
এ বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সিরিয়ায়, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র তুরস্ক ও ইসরায়েলের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। আঙ্কারার দৃষ্টিতে আসাদ-পরবর্তী সিরিয়া সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং কুর্দি প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে এ একই ভূখণ্ডের গুরুত্ব ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য হলো নিজেদের সীমান্তের কাছে শত্রুভাবাপন্ন সামরিক সক্ষমতা গড়ে ওঠা ঠেকানো এবং সম্ভাব্য হুমকিগুলোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্বল অবস্থায় রাখা।
এ দুই ভিন্ন স্বার্থের কারণে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে স্পষ্ট টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে সিরিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছেন। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের সেনাবাহিনী এখন কতটা কাছাকাছি ও একই এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইরানের জন্য এই তুরস্ক ও ইসরায়েলের টানাপোড়েন একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
তুরস্ক যদি এমনিতেই ইসরায়েলের কার্যক্রম সীমিত করতে এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাব রাখতে সম্পদ ও শক্তি বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়, তাহলে তেহরান নিজে সামনে না এসে ধৈর্যশীল পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকতে পারে। এর জন্য ইরান ও তুরস্কের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতার প্রয়োজন নেই।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সাম্প্রতিক সামরিক সমীকরণ তুরস্কের এ প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গ্রিস, ইসরায়েল ও সাইপ্রাস ২০২৬ সালে যৌথ বিমান ও নৌ মহড়ার পরিসর বাড়াতে চায়। তুরস্কে এই তিন দেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতাকে এমন এক প্রতিরক্ষাকাঠামো হিসেবে দেখা হয়, যা আঙ্কারার জন্য প্রতিকূল কৌশলগত পরিবেশ তৈরি করছে। এ ব্যবস্থার অংশ না হয়েও ইরান এর সুফল পেতে পারে। তুরস্কের এ অনুভূতি যত বাড়বে, আঙ্কারার পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
এর ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার কিছু বোঝা স্বাভাবিকভাবেই ইরানের কাঁধ থেকে সরে যাবে। তুর্কি নীতিনির্ধারকেরা যদি ইসরায়েলকে শুধু সিরিয়ার একটি পক্ষ হিসেবে নয়; বরং তুরস্ককে চাপে রাখার একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে তাঁরা এমন খরচ বহনে রাজি হবেন, যা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের কার্যপরিধি সীমিত করবে।
দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি ক্ষেত্র গড়ে উঠছে লোহিত সাগর, বাব আল মান্দাব ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলজুড়ে, যেখানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ্য ভাঙন তৈরি করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিষয়ে সৌদি আরব কড়া বার্তা দেয়।
মুকাল্লা বন্দরে সৌদি হামলার পর এ উত্তেজনা চরমে ওঠে এবং দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। কারণ, তারা ইয়েমেনের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে। ইরানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে নয় যে তেহরান এই ফাটল তৈরি করেছে; বরং এই দ্বন্দ্ব সেই জোটগুলোর ঐক্য ও মনোযোগ দুর্বল করে দেয়, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও তার মিত্রদের বিরোধিতা করে এসেছে। যখন রিয়াদ ও আবুধাবি একে অপরের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন ইরানের ওপর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
হর্ন অব আফ্রিকা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইসরায়েল সোমালি ল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে লোহিত সাগর অঞ্চলে একটি নতুন ও সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন সামুদ্রিক নিরাপত্তা আগেই চ্যালেঞ্জের মুখে। সেখানে সামরিক ঘাঁটি হবে কি না বা ইসরায়েলের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সে বিতর্ক যাই থাকুক, এ সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। হুতিরা প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছে যে সোমালি ল্যান্ডে ইসরায়েলের যেকোনো উপস্থিতিকে তারা সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে।
এ অঞ্চল যত বেশি আন্তর্জাতিক শক্তির সম্পৃক্ততায় জড়িয়ে পড়ছে, তত বেশি অস্থিরতার খরচ নানা পক্ষের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরানের জন্য সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আরও কমে যাচ্ছে।
এর কোনোটিই স্থায়ী বা টেকসই ভারসাম্যের নিশ্চয়তা দেয় না। দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল অনেক সময়ই সাময়িক হয়। এটি তত দিন কাজ করে, যত দিন বোঝা বহনকারী পক্ষ মনে করে যে খরচ সহনীয়। একসময় সেই পক্ষ খরচ বেশি মনে করলে উত্তেজনা বাড়ানো, দর–কষাকষি করা কিংবা নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে সেই চাপ আবার অন্যের ওপর ঠেলে দিতে চায়।
তুরস্ক শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার পথ বেছে নিতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার উত্তেজনাও কমে যেতে পারে, আর ইয়েমেনের ভেতরের পরিস্থিতি নতুনভাবে আঞ্চলিক হিসাব–নিকাশ বদলে দিতে পারে।
হামিদ বহরামি লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক–বিশ্লেষক
মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত