মতামত

সমান্তরাল আদালত, পলাতক রাষ্ট্র

তিন দিন ধরে একটা ছবি মাথা থেকে নামাতে পারছি না। ছবিটা শামীমের মরদেহের নয়। সেই মরদেহের ছবির নিচের মন্তব্য ঘরের। সারি সারি ‘আলহামদুলিল্লাহ’। একজন মানুষকে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বার থেকে টেনে বের করে পেটানো হলো, পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিল, সেখান থেকে আবার ছিনিয়ে এনে পেটানো হলো, পথে তিনি মারা গেলেন। আর অগণিত মানুষ সেই মৃত্যু উদ্‌যাপন করল স্রষ্টার প্রশংসায়! আমি ক্ষুব্ধ। বিষণ্ন। সত্যি বলতে কিছুটা ভীতও।

তবে এই ক্ষোভের নিচে কয়েকটা প্রশ্ন ক্রমাগত খোঁচাচ্ছে: সাতক্ষীরার দেবহাটায় শামীমের মৃত্যু কি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের অনুপস্থিতি, নাকি এক সমান্তরাল আইনের উপস্থিতির ঘোষণা? নাকি আদতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নাই হয়ে যাওয়ার ঘোষণা? কে অসুস্থ? শামীম, উসকানিদাতা নাকি রাষ্ট্র? নাকি আসলে আমাদের এই পুরো সমাজই এখন এক জটিল বিকৃতিতে অসুস্থ?

আইন প্রয়োগের অনুপস্থিতি মানে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা। তারপরও সেখানে অপরাধী লুকায়, পালায়, কারণ সে জানে সে অন্যায় করছে। আইন এখন প্রয়োগ হচ্ছে না, যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু সমান্তরাল আইন মানে ভিন্ন এক কর্তৃত্ব। সেখানে ‘বিচারক’ প্রকাশ্যে অভিযোগ পড়েন, রায় দেন, দণ্ড কার্যকর করেন, তারপর তৃপ্তি প্রকাশ করেন। দেবহাটায় দ্বিতীয়টাই ঘটেছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, প্রধান অভিযুক্ত দুই দফা ফেসবুক লাইভে অভিযোগ শুনিয়েছেন, ঠিকানা জানিয়েছেন, লোক ডেকেছেন; মৃত্যুর পর পোস্ট দিয়ে তা নিশ্চিতও করেছেন। ‘মব’ বলতে আমরা এত দিন যে মুখহীন, নামহীন জনতার ছবি আঁকতাম, এ তা নয়। এর মুখ আছে, মঞ্চ আছে, কার্যপ্রণালি আছে। আদালত বসেছে মোবাইলের পর্দায়, সাক্ষ্য হিসেবে পেশ হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার এক গোপন রেকর্ড, জুরির আসনে লাইভের দর্শক।

ছকটাও নতুন নয়: সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ, লোক জড়ো করা, তারপর প্রকাশ্য আক্রমণ। বুড়িমারী থেকে ভালুকা, গোয়ালন্দ থেকে কুষ্টিয়া, ঘটনার বিন্যাস প্রায় হুবহু। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার রাষ্ট্রকে চিনিয়েছিলেন বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া দাবিদার হিসেবে।

জার্মান রাজনৈতিক দার্শনিক কার্ল শ্মিটের রাজনীতি নিয়ে আপত্তি থাকলেও তাঁর একটি সূত্র এখানে অস্বস্তিকরভাবে খাটে: সার্বভৌম সে-ই, যে ব্যতিক্রমের সিদ্ধান্ত নেয়। কে ‘মুরতাদ’, কার জীবন আর আইনের সুরক্ষা পাবে না, দেবহাটায় সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একজন সাবেক ইমাম, যিনি এখন গ্রামের বাজারে পশু জবাই করেন। সার্বভৌমত্ব আজ এতই সস্তা যে একটা স্মার্টফোন আর একটা ‘অনুভূতি’ থাকলেই তা ভাড়া নেওয়া যায়।

লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ প্রথম আলোয় লিখেছেন, ‘যখনই “ধর্ম অবমাননা”র মতো সংবেদনশীল অভিযোগ তোলা হয়, তখন পুলিশ-প্রশাসন প্রায় “সক্রিয়” ভাবেই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অপরাধ ঘটার আগে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তে এবং এমনকি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরও তাদের এই “নিষ্ক্রিয়তা” বজায় থাকে।’

শামীমের ঘটনা এতে আরও নির্মম মাত্রা যোগ করেছে। পুলিশ এসেছিল, উদ্ধারও করেছিল; রাষ্ট্র একবার হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু সেই হাত হাসপাতালের ওয়ার্ড পর্যন্তও তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। যুদ্ধের মধ্যেও হাসপাতাল শেষ আশ্রয় বলে গণ্য হয়; আমাদের রাষ্ট্র শান্তিকালে সেই আশ্রয়টুকুও দিতে পারল না। উদ্ধার করে ফেলে রাখা নিছক নিষ্ক্রিয়তার চেয়েও ভয়ংকর। একে আইনশৃঙ্খলার ‘অবনতি’ বললে কম বলা হয়; এ রাষ্ট্রের অস্তিত্বেরই সংকট।

তবে রাষ্ট্রকে কেবল উদাসীন বললে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ নামের বর্গটি দণ্ডবিধি থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইন পর্যন্ত দশকের পর দশক লালন করেছে রাষ্ট্র নিজেই। মব আসলে রাষ্ট্রেরই শেখানো ভাষায় কথা বলছে, কেবল থানা, আদালত আর কারাগারের ধাপগুলো ডিঙিয়ে। এই অনুভূতির রাজনীতি একমুখীও। শামীমের স্ত্রী, দুই ছেলে আর ভাইদের অনুভূতিতে কতটা আঘাত লাগল, তা কোনো ধারায় লেখা নেই। পরিচয়বাদী রাজনীতির আসল ক্ষমতা এখানেই: কার অনুভূতি গণনায় আসবে আর কারটা আসবে না, সেই সীমারেখা টানা।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় মব করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তরা

ডিজিটাল জনপরিসর এখানে নতুন এক উপাদান যোগ করেছে: দর্শক। লাইভের পর্দায় হত্যা আর গোপন অপরাধ থাকে না, হয়ে ওঠে প্রদর্শনী। প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি মন্তব্য পারফরমারদের প্রতীকী পুঁজি বাড়ায়। অভিযুক্ত দাবি করেছেন, তিনি কোনো দলের নন। দল আদতে আছে। ক্ষমতার কলকাঠি রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে অনেকটাই। দলের প্রশ্রয় ছাড়া এই রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ টেকসই হয় না। দলগুলো নিন্দা জানিয়ে দায় সারে। অথচ এমন স্বঘোষিত ‘বিচারকের’ জন্মের মাঠ তারাই উর্বর করেছে: ভোটের হিসাবে, মঞ্চে, প্রশ্রয়ে এবং নীরবতায়। ক্ষমতার শূন্যস্থান কখনো শূন্য থাকে না।

এই সমষ্টিগত উল্লাসকে কেবল ‘ধর্মান্ধতা’ বলে খারিজ করলে আত্মতৃপ্তি মিলতে পারে, দরকারি বোঝাপড়া মেলে না। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড দেখিয়েছিলেন, ভিড়ের ভেতরে মানুষ নিজের বিবেক নেতার হাতে সঁপে দেয়; নেতা হয়ে ওঠেন তার আদর্শ-অহম, আর ব্যক্তির অপরাধবোধ গলে মিশে যায় সমষ্টিতে। শামীমের বুকে যিনি পা তুলেছিলেন, একা থাকলে হয়তো তিনি পথে পড়ে থাকা আহত কাউকে পানি এগিয়ে দিতেন। ভিড় তাকে মুক্তি দিয়েছে, দায় থেকে, দ্বিধা থেকে।

সমাজ–গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সমাজের অন্তরে অস্থিরতা থাকলে নিজের অস্থিরতা উগরে দিতে একজন বলির পাঁঠা খোঁজে। আর সেই বলি প্রায়ই প্রান্তের মানুষ, ‘অপর’ ‘বহিরাগত’, ‘অসুস্থ’, ‘পাগল’। পরিবার জানিয়েছে, শামীম দীর্ঘদিন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন, শেষ দফা মারধরের আগের দিন বিষও খেয়েছিলেন। ভেঙে পড়া মানুষটিই ছিলেন সবচেয়ে নিরাপদ শিকার। তাঁকে মেরে একটা জনপদ কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে পবিত্র ও ঐক্যবদ্ধ ভাবতে পেরেছে।

শিক্ষক হিসেবে আরেকটি তথ্য আমাকে ছাড়ছে না। শামীম অসুস্থ মনে, ঘরের ঝগড়ায় কী বলেছিলেন, তার বিচারের এখতিয়ার রাস্তার ছিল না। আদালতেরও আগে সেখানে দরকার ছিল একজন চিকিৎসকের। আমরা তাঁকে চিকিৎসা দিইনি, সুরক্ষা দিইনি, শেষে বিচারও দিইনি। তাঁর দুই ছেলে এখন বড় হবে এমন দেশে, যেখানে বাবার মৃত্যুর ভিডিও আর তার নিচের উল্লাস ইন্টারনেটে থেকে যাবে চিরকাল।

তাহলে শুরুর অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোতে ফিরি। শামীমের মৃত্যু যদি কেবল আইনের বা আইন প্রয়োগের অনুপস্থিতির ফল হতো, দাবিটা সহজ হতো: আরও পুলিশ দাও, তাদের দ্রুত বিচার করো ইত্যাদি। কিন্তু দেবহাটায় যা ঘটেছে, তা এক সমান্তরাল আইনের প্রকাশ্য অভিষেক। দ্রুত বর্ধনশীল সামাজিক ব্যাধির প্রকাশ। আর তার জবাব কেবল বাড়তি টহল নয়। মামলা হয়েছে, পুলিশ বলছে অভিযান চলছে।

কিন্তু কুষ্টিয়া, গোয়ালন্দ, ভালুকার পর এমন আশ্বাস আর কাউকে আশ্বস্ত করে না। দৃষ্টান্তমূলক বিচারের একটি নজিরও আমরা দেখিনি। দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক বিচার আর ‘অনুভূতি’র আইনি অস্ত্রটির পুনর্বিবেচনা ছাড়া রাষ্ট্র তার হাতছাড়া সার্বভৌমত্ব ফিরে পাবে না। নইলে দেবহাটার সেই সমান্তরাল আদালতই একদিন হয়ে উঠবে আমাদের আসল আদালত, আর আমরা প্রত্যেকে তার সম্ভাব্য আসামি।

  • কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব