
গত কয়েক দশকে ওয়াশিংটনের ভূরাজনীতি সাজানো হয়েছিল একটি বিশেষ ধারণার ওপর—ফিলিস্তিন সংকটকে আড়ালে ঠেলে দিয়েও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ সম্ভব। সেই ধারণার চূড়ান্ত রাজনৈতিক বাস্তবায়ন ছিল ২০২০ সালে শুরু হওয়া ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানকে ইসরায়েলের সঙ্গে এক টেবিলে বসিয়ে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার প্রায় পূর্ণ আয়োজন শেষ হয়ে এসেছিল।
এমনকি রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যখন পরমাণু প্রযুক্তি ও সামরিক সুরক্ষার বিনিময়ে ইসরায়েলকে মেনে নেওয়ার চূড়ান্ত দর–কষাকষি চলছিল এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে ‘ইসরায়েল দিন দিন ঘনিষ্ঠ’ হচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী দুই বছরের গাজা যুদ্ধ সেই সাজানো তাসকে এক ঝটকায় উল্টে দেয়।
গাজার যুদ্ধ দ্রুত এক আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। লেবাননে হিজবুল্লাহর জড়িয়ে পড়া, ইয়েমেনের হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক অবরোধ, সিরিয়ার সমীকরণ পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ বেধেই যায়। ‘স্বাভাবিকীকরণ’ চেষ্টার পেছনে কত বড় অস্বাভাবিক সুড়ঙ্গ লুকিয়ে ছিল, সেটা বিকট আকারে উন্মোচিত হয়ে পড়ে।
এমনকি ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কাঠামো অনুমোদিত হয়, ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি হয় এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার ‘অন্তর্বর্তী প্রশাসন’ হিসেবে দায়িত্ব নেয়—তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কতটা ঠুনকো, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গত কয়েক মাসে।
সর্বশেষ যখন হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয়েছে, তখনো ইসরায়েলি বাহিনী গাজার প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখলে রেখেছে এবং ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা—যেমন ইতামার বেন–গভির—প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছেন যে তাঁরা ২০০৫ সালে গাজায় ভেঙে ফেলা ইহুদি বসতি আবার গড়ে তুলবেন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু দখলদারি ও দমননীতির বাস্তবতা থামেনি। জুলাই মাসেও গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১৫২; যার মধ্যে ২০ শিশুও রয়েছে।
ওদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে দ্বিচারিতাই আরব শাসকদের কঠিন দ্বিমুখী সংকটে ফেলেছে: একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রচ্ছায়ার ওপর তাদের চিরন্তন নির্ভরতা, অন্যদিকে নিজেদের দেশের রাজপথে উছলে পড়া তীব্র ইসরায়েলবিরোধী জনমত। সেই নির্ভরতাও অবশ্য টেকেনি ইরানের হামলার সামনে। মার্কিনরা তাদের দেশ রক্ষায় এগিয়ে আসেনি, বরং বিপদে ফেলে আখের গোছাচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া বৈশ্বিক পরাশক্তিগত টানাপোড়েনের সঙ্গে এই সংঘাত যুক্ত হওয়ায় ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের জলাভূমিতে আটকে পড়েছে, মস্কো ও বেইজিং তখন পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক একঘরে অবস্থা থেকে বাঁচতে ইসরায়েল মরিয়া হয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো বড় মুসলিম দেশগুলোকে নিজ নিজ বলয়ে টানার কৌশল আঁকছে।
তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে দূরগামী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ঘটেনি; তা ঘটেছে খোদ পশ্চিমা রাজনীতির নীতিনির্ধারণী কক্ষে ও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে। আর সেই পরিবর্তনের প্রমাণ এখন আর ভবিষ্যদ্বাণী নয়—তা ঘটে গেছে চোখের সামনে, বিলেতের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার আর নিউইয়র্কের সিটি হলে।
ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলন এত দিন পশ্চিমে শুধু প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজপথের মিছিলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গাজায় চলমান হত্যাযজ্ঞ সেই আন্দোলনকে সরাসরি পশ্চিমা দেশের সংসদীয় ও স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণের মূলধারায় টেনে এনেছে—এবং এখন তা আর আন্দোলন নয়, ক্ষমতার হাতবদলেরও কারণ।
নিউজিল্যান্ডের ‘অ্যাকটিভিস্ট’ পল হপকিনসনের নেতৃত্বে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ (আনুষ্ঠানিক স্লোগান: ফ্রি প্যালেস্টাইন ফ্রম রিভার টু সি) নামের একটি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে, যা আগামী ৭ নভেম্বর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার শেষ ধাপে রয়েছে।
একক ইস্যুভিত্তিক একটি দলের এভাবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি প্রমাণ করে, ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আর কোনো দূরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়—তা পশ্চিমা রাজনীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে।
একই হাওয়া বইছে ইউরোপের রাজনীতিতেও। ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে একযোগে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, পরে স্লোভেনিয়াও একই পথে হাঁটে—প্রথাগত মার্কিন অক্ষ থেকে বেরিয়ে আসা এই সিদ্ধান্তকে কার্নেগি এন্ডোমেন্টের বিশ্লেষকেরা ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী মার্কিন-নির্ভর পররাষ্ট্রনীতিতে এক অভূতপূর্ব ফাটল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গাজার ওপর চাপানো অবরোধ ভাঙতে গড়ে ওঠা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ত্রাণবহরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যরা সরাসরি অংশ নিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রের নিস্পৃহতাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেছেন—একজন নির্বাচিত আইনপ্রণেতার নিজের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে এভাবে সরাসরি মাঠে নামা ইউরোপীয় রাজনীতিতে বিরল দৃশ্য।
যুক্তরাজ্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে ধরা পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঠিক আগে, ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একটি ভিডিও বার্তায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির শুরুর দিকের অবস্থান ‘ঠিক ছিল না’। জনরোষ ও দলের ভেতরের চাপে কিয়ার স্টারমারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, আর ২০ জুলাই বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ এটি নিছক প্রতীকী ক্ষমাপ্রার্থনা নয়—গাজা নীতিতে ব্যর্থতা একটি শাসকদলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রকাশ।
লেবার পার্টি থেকে ছিটকে পড়া মুসলিম ও প্রগতিশীল ভোটারদের একটি বড় অংশ গ্রিন পার্টি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে সরে গিয়েছিল বলে জরিপে উঠে এসেছে, যা মূলত এই দলবদলকে ত্বরান্বিত করেছে। বার্নহ্যাম এখন পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন মুসলিম ও প্রগতিশীল তরুণদের ভোটব্যাংক উপেক্ষা করে আর ক্ষমতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের গভীরে। ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলকে অন্ধ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়াকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের জন্যই এক অলঙ্ঘনীয় ‘পবিত্র চুক্তি’ মনে করা হতো। ২০২৬ সালের গ্যালাপ জরিপ সেই মিথকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে দিয়েছে।
২০০১ সাল থেকে যে জরিপ চালিয়ে আসছে গ্যালাপ, সেই ২৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি ইসরায়েলিদের ছাড়িয়ে গেছে—৪১ শতাংশ মার্কিন এখন ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, বিপরীতে ইসরায়েলিদের পক্ষে মাত্র ৩৬ শতাংশ। অথচ ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল গড়ে ৪৩ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থাকত; অক্টোবর ৭-এর হামলার ঠিক আগেও, ২০২৩ সালে, ইসরায়েলিদের পক্ষে ছিল ৫৪ শতাংশ, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ।
তিন বছরে এই ব্যবধান সম্পূর্ণ উল্টে যাওয়া, গ্যালাপের নিজস্ব বিশ্লেষক যাকে বলছেন ‘প্রথমবারের মতো সমতায় পৌঁছানো’—আধুনিক মার্কিন জনমত জরিপের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি তরুণ প্রজন্ম, তবে তা আর তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ এখন ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল, ইসরায়েলের পক্ষে মাত্র ২৩ শতাংশ—এই বয়সসীমায় এটিই প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল ফিলিস্তিনপন্থী মত। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যেও মত পুরোপুরি উল্টে গেছে: ২০২৫ সালে যেখানে ৪৫ শতাংশ ইসরায়েলের পক্ষে ও ৩৩ শতাংশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ছিল, ২০২৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ও মাত্র ২৮ শতাংশ ইসরায়েলের পক্ষে।
এমনকি ৫৫–ঊর্ধ্ব প্রবীণ আমেরিকানদের মধ্যেও ২০০৫ সালের পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলপন্থী মত অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। দলীয় বিভাজনও প্রকট, ডেমোক্র্যাটদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ফিলিস্তিনের পক্ষে, যেখানে ২০১৩ সালেও দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল ইসরায়েলপন্থী। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের প্রায় সাত-দশমাংশ এখনো অবিচল ইসরায়েলের পক্ষে। অর্থাৎ ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম গভীরতম দলীয় বিভাজনরেখায় পরিণত হয়েছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখনো দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করেন, যা ২০০৩ সালের রেকর্ড উচ্চতার প্রায় কাছাকাছি।
এই মানসিক রূপান্তরের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রতিফলন এখন নিউইয়র্কের সিটি হলে। জোহরান মামদানি এখন নির্বাচিত মেয়র। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ২০২৪ সালের পরোয়ানা প্রসঙ্গে মামদানি প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে জানান, শহরের নিজস্ব আইনি এখতিয়ারে ওই পরোয়ানা কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে তিনি ফেডারেল সরকারের প্রতি তা কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দেন, নেতানিয়াহুকে কোনোভাবেই গ্রেপ্তার করা হবে না; আর নেতানিয়াহু নিজে পাল্টা জবাবে বলেন, তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দিতে নিউইয়র্কে যাবেনই।
ফিলিস্তিন আজ আর স্রেফ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ভূখণ্ড উদ্ধারের সংঘাত নয়। নিউজিল্যান্ডে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া একক-ইস্যু রাজনৈতিক দল, গাজা নীতির কারণে যুক্তরাজ্যে সরকারপ্রধানের পতন ও নতুন প্রধানমন্ত্রীর অভিষেক, স্পেন-আয়ারল্যান্ড-নরওয়ে-স্লোভেনিয়ার কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমতের অগ্রগামিতা ও একজন ফিলিস্তিনপন্থী মেয়রের নিউইয়র্ক জয়—এই প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে, পশ্চিমা বিশ্ব আর কখনোই গাজা-পূর্ববর্তী পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণে ফিরে যেতে পারবে না।
এই টানাপোড়েনই বলে দেয়, ফিলিস্তিন প্রশ্ন মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির কতটা কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। উল্লেখযোগ্য, এপি-এনওআরসি-র এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও মামদানির প্রতি সমর্থন নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি, এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মার্কিন ইহুদি মনে করেন গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে—এই তথ্য প্রমাণ করে, বিভাজনরেখাটি নিছক ধর্মীয় নয়, বরং আদর্শগত ও প্রজন্মগত।
সর্বশেষ নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন গিয়েছেন সত্য, কিন্তু সফরের শুরুতেই প্রকাশিত এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের পরিবর্তনের অভূতপূর্ব রূপ। গত ২৮ জুলাই ‘দ্য ইকোনমিস্ট/ইউগভ’ কর্তৃক প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ৪৯ শতাংশ আমেরিকান আইসিসির পরোয়ানা মেনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের সমর্থন করছেন। পাশাপাশি, ৪৭ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন তিনি গাজায় যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও জনমতে এই ধরনের অবস্থান মাত্র এক দশক আগেও ছিল সম্পূর্ণ কল্পনাতীত।
অবশ্য জনমতে এমন বিশাল পরিবর্তন সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের মূল পররাষ্ট্রনীতি বা সামরিক সহায়তা থেকে ইসরায়েলকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইসরায়েল লবি (যেমন এআইপ্যাক), প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও সামরিক-শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ, এবং প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা। সাধারণ আমেরিকানদের মনোভাব দ্রুত বদলালেও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর পরিবর্তনের গতি ঢের ধীর—আমেরিকার বর্তমান রাজনীতি মূলত জনগণের উদীয়মান নৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ঐতিহাসিক স্বার্থের সংঘর্ষক্ষেত্র।
দ্য কায়রো রিভিউ অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র আল-শাবাকা-র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গাজা সংকট পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত ‘আইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা’র কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সময় পশ্চিমারা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের যেসব বুলি আওড়েছিল, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তাদের কূটনৈতিক সমর্থন ও দ্বিধা সেই আদর্শের ধারাবাহিকতা নিয়েই বিশ্বমঞ্চে প্রশ্ন তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং আইসিসির পরোয়ানা—এই দুটি বিষয় গ্লোবাল সাউথের চোখে পশ্চিমা ‘নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলা’র ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। অবশ্য ইসরায়েল ও তার মিত্ররা এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু বিতর্কের এই দুই পক্ষ যেভাবেই যুক্তি সাজান না কেন, একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত নেই—এই বিতর্কই আজ পশ্চিমা নীতির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গ্লোবাল সাউথের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
ফিলিস্তিন আজ আর স্রেফ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ভূখণ্ড উদ্ধারের সংঘাত নয়। নিউজিল্যান্ডে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া একক-ইস্যু রাজনৈতিক দল, গাজা নীতির কারণে যুক্তরাজ্যে সরকারপ্রধানের পতন ও নতুন প্রধানমন্ত্রীর অভিষেক, স্পেন-আয়ারল্যান্ড-নরওয়ে-স্লোভেনিয়ার কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমতের অগ্রগামিতা ও একজন ফিলিস্তিনপন্থী মেয়রের নিউইয়র্ক জয়—এই প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে, পশ্চিমা বিশ্ব আর কখনোই গাজা-পূর্ববর্তী পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণে ফিরে যেতে পারবে না।
রাজপথ ও ব্যালটের এই লড়াই পশ্চিমা আধিপত্যের ভিত্তিপ্রস্তরকে চিরতরে বদলে দিয়েছে—যদিও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী কক্ষে সেই পরিবর্তনের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটতে এখনো অনেকটা পথ বাকি।
মনযূরুল হক প্রথম আলোর জেষ্ঠ্য সহসম্পাদক