
বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক শেষে শুক্রবার চীন ছাড়লেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকটি ছিল জাঁকজমক, আড়ম্বর ও স্থিতিশীলতার নানা প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর। কিন্তু বাস্তব ফলাফলের বিচারে তা অনেকটাই শূন্য। দুই দিনের এই বৈঠকে ট্রাম্প যোগ দেন ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপে দুর্বল অবস্থায়। সেই দুর্বলতার ধারণা বদলানোর মতো কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপও তিনি নিতে পারেননি। বরং বৈঠকে সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে দেখা যায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে, বিশেষ করে তাইওয়ান প্রসঙ্গে। সেখানে ট্রাম্পের তরফে তেমন কোনো জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
বেইজিংয়ে শেষ দিনের বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, আমেরিকা ও চীনের মধ্যে ‘দারুণ’ বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে এবং অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু সেই চুক্তির কোনো স্পষ্ট বিবরণ সামনে আসেনি। সমালোচকদের মতে, এই বৈঠক যতটা না বাস্তব অগ্রগতির জন্য, তার চেয়ে বেশি ছিল সুচারুভাবে সাজানো এক প্রদর্শনী।
প্রযুক্তিজগতের শীর্ষ কর্তা ইলন মাস্ক ও টিম কুক, ট্রাম্পের ছেলে এরিকসহ অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ইরান, তাইওয়ান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা—কোনো ক্ষেত্রেই বড় কোনো সাফল্য আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে আমেরিকার সঙ্গে এই কৌশলগত অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জুলিয়ান গেওয়ার্টজ বলেন, চীন চাইছে এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের মেয়াদজুড়েই বজায় থাকুক। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ সিনবো বলেন, এখন দুই দেশের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। আগে আমেরিকাই সব সময় এগিয়ে থাকত, কিন্তু এখন দুই দেশ প্রায় সমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
চীন ছাড়ার সময় ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘চীনের একটি বলরুম আছে, আমেরিকারও থাকা উচিত।’ হোয়াইট হাউসে ৪০ কোটি ডলারের একটি বলরুম নির্মাণের তাঁর পুরোনো পরিকল্পনার কথাই যেন আবার মনে করিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু দেশে ফিরে ট্রাম্পকে সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা হলো ইরান যুদ্ধ।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা তাঁর জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে প্রণালি খুলতে চীনকে কতটা চাপ দিচ্ছে আমেরিকা; আর চীন সেই চাপ মানবে কি না।
বেইজিংয়ের ঝংনানহাই উদ্যানের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ইরান প্রসঙ্গে দুই দেশের মতামত অনেকটাই এক। তারা চায় না ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করুক এবং চায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হোক। তাঁর কথায়, ওই পরিস্থিতি ‘অস্বাভাবিক’ এবং ‘এভাবে চলতে পারে না’। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা একমত হয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা থাকা জরুরি, যাতে জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। সি চিন পিং স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি এই প্রণালির সামরিকীকরণের বিরোধী।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি ভাবছেন—ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা চীনা সংস্থাগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যায় কি না। তিনি জানান, সি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেবে না। তবে একই সঙ্গে চীন ইরানের তেল কেনা চালিয়ে যেতে চায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ইরানে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন এবং যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া উচিত। যদিও চীনের প্রায় অর্ধেক তেল এই পথ দিয়ে আসে, তবু তাদের বড় চিন্তা—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনে, তবে তা তাদের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্নে চীন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়। সি চিন পিং সতর্ক করে বলেন, এই বিষয়টি ঠিকভাবে সামলানো না হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হতে পারে। তিনি এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন। ট্রাম্প অবশ্য বলেন, তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকার নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন, দ্বীপটিকে বড় পরিসরে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর মতে, তাইওয়ান নিয়ে সংঘর্ষের সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের এই চীন সফর ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁকে ঘিরে ছিল জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, টেম্পল অব হ্যাভেন পরিদর্শন ও গ্রেট হল অব দ্য পিপলে রাজকীয় ভোজ।
সি সেখানে বলেন, চীনের ‘মহান পুনরুত্থান’ ও ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’—দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে এগোতে পারে। শেষ দিনের বৈঠকে ট্রাম্প বাগানের গোলাপ দেখে মুগ্ধ হন এবং জানান, সি তাঁকে হোয়াইট হাউসের জন্য গোলাপের বীজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, এই সফর ‘অসাধারণ’ এবং দুই দেশের জন্য ‘চমৎকার’ বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, চীন আমেরিকার তেল, সয়াবিন ও ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে রাজি হয়েছে, এমনকি ৭৫০টি বিমান কেনার সম্ভাবনাও রয়েছে। যদিও চীনের তরফে এই দাবির কোনো নিশ্চিতকরণ মেলেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে আমেরিকার সঙ্গে এই কৌশলগত অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জুলিয়ান গেওয়ার্টজ বলেন, চীন চাইছে এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের মেয়াদজুড়েই বজায় থাকুক। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ সিনবো বলেন, এখন দুই দেশের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। আগে আমেরিকাই সব সময় এগিয়ে থাকত, কিন্তু এখন দুই দেশ প্রায় সমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
ইউ-চেন লি আন্তর্জাতিক বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত