
ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পর প্রথমে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—দুজনই আলোচনাকে ‘ভালো’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখনো ধারালো ছুরির ফলার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ইরান থেকে এক হাজার কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করছে এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আরও অন্তত একটি ক্যারিয়ার গ্রুপ এই অঞ্চলে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তার বহু আকাশপথের সামরিক সম্পদও এই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে এনে জড়ো করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে, এ ধরনের সামরিক শক্তি প্রদর্শন আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে না। ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডাররা স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের আঙুল এখনো ট্রিগারের ওপর রয়েছে।
এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রস্তাবিত চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশ করে আল-জাজিরা। তাদের দাবি অনুযায়ী কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীরা খসড়াটিকে উভয় পক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখবে; এরপর সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ১ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ করবে। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত একটি তৃতীয় দেশে হস্তান্তর করা হবে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রস্তাবটিতে ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু না করার অঙ্গীকার করতে হবে এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র বা প্রযুক্তি হস্তান্তর না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবে কোনো পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। বিস্ময়করভাবে খসড়াটিতে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী দেবে (বিশেষ করে ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি), সে সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নেই।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইসরায়েলি চাপ সত্ত্বেও সব পক্ষই শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করবে, যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কিছু করতে চাপ দিচ্ছে, যা সে নিজে করতে পারছে না। কারণ, তাদের অতিরঞ্জিত ও হত্যাপ্রবণ সামরিক যন্ত্র মূলত নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতেই বেশি পারদর্শী।
ইরান তুরস্কে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়, যদিও কাতার, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকেও এ প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তেহরান এই অবস্থানে অনড় থাকে যে আলোচনা সেখান থেকেই শুরু হতে হবে, যেখানে তা থেমে গিয়েছিল (যখন গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালায়)।
আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘খারাপ বিশ্বাসে’ ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল, সেটিই শুধু তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেনি; ২০১৫ সালের যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নিয়ে অভিজ্ঞতাও ইরানের অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। ওই চুক্তির আওতায় ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখতে সম্মত হয়েছিল। সে সময় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আব্বাস আরাগচি ছিলেন এই চুক্তির প্রধান স্থপতিদের একজন।
ওবামা প্রশাসনের সময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। কিন্তু সীমিত যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা প্রত্যাহার করেন। ইসরায়েলের বর্ণবাদী রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করে তিনি একতরফাভাবে চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেন এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির আওতায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
পরবর্তী পাঁচ বছরে ইরান ধীরে ধীরে তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। একপর্যায়ে ইউরেনিয়াম প্রায় অস্ত্র-মান (৬০ শতাংশের বেশি) পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকারও সীমিত করে। সাবেক পেন্টাগন উপদেষ্টা ও খ্যাতিমান পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ থিয়োডর পোস্টল বলেন, ইরানকে একটি অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইসরায়েলি চাপ সত্ত্বেও সব পক্ষই শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করবে, যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কিছু করতে চাপ দিচ্ছে, যা সে নিজে করতে পারছে না। কারণ, তাদের অতিরঞ্জিত ও হত্যাপ্রবণ সামরিক যন্ত্র মূলত নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতেই বেশি পারদর্শী।
আব্বাস নাসির ডন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত