
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জোর করে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিলেন, তখন ইউরোপের তাঁর ভক্তদের শিশুসুলভ কল্পনা ভেঙে পড়ল। ব্রিটেনের নাইজেল ফারাজ, ফ্রান্সের জর্ডান বারদেলা, জার্মানির আলিস ভাইডেল, ইতালির মাত্তেও সালভিনি, স্লোভাকিয়ার রবার্ট ফিকো, হাঙ্গেরির ভিক্তর ওরবান, পোল্যান্ডের মাতেউশ মোরাভিয়েত্সকির মতো ইউরোপের ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, তাঁরা সবাই মিলে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক যৌথ বিদ্রোহে আছেন।
কিন্তু এখন তাঁদের সেই ‘নায়ক’ই ইউরোপের এক মিত্রদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড দখলের কথা বলছেন। পুরোটা না হোক, অন্তত আংশিকভাবে, কোনো এক তথাকথিত ‘চুক্তি’র মাধ্যমে তিনি সেই ভূখণ্ড চান।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী নেতাদের প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। কেউ চুপ। কেউ কথা ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার স্পষ্ট অস্বস্তিতে। এতে পরিষ্কার হয়ে যায়—ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আসলে সব সময়ই ছিল ভণ্ডামিতে ভরা। তাঁরা কখনোই তাঁর সহযোগী ছিলেন না। ছিলেন ব্যবহারযোগ্য খেলনা মাত্র।
এই নেতারা প্রকাশ্যে এটা বলবেন না। কিন্তু মনে মনে তাঁরা ভেবেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে মতাদর্শের মিল আছে বলেই তিনি তাঁদের পাশে থাকবেন। এত বছর তাঁকে সমর্থন করার বদলে অন্তত কিছু সম্মান বা গুরুত্ব তাঁরা পাবেন।
কিন্তু বাস্তবটা ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। যে শক্তিশালী মানুষটি কোনো ক্ষতি ছাড়াই আপন করে নিয়েছিল, তিনি আসলে সম্পর্ক গড়তে তাঁদের ডাকেন না। দরকার হলে অপমান করার জন্যই তিনি তাঁদের বারবার ডাকেন।
আজ ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা যা বুঝছেন, ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকেরা এখনো তা বোঝেননি। তাঁরা বোঝেননি, ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে কিছুই পাওয়া যায় না। কারণ, নিজের আধিপত্যের প্রদর্শনী ছাড়া তাঁর কাছে বিক্রি করার মতো কিছু নেই।
এই ভুল শুধু ডানপন্থীদের নয়। ইউরোপের মূলধারার নেতারাও একই ভুল করেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, ট্রাম্পকে তুষ্ট করা যাবে। একটু সহযোগিতা করলে, একটু ছাড় দিলে, তিনি নরম হবেন। কিন্তু তাঁরা মানুষটিকে ভুল বুঝেছেন। ট্রাম্প সহযোগিতা চান না। তিনি চান যন্ত্রণাদায়ক আত্মসমর্পণ।
কিছু বিশ্লেষক এখন বলছেন, দাভোসে ইউরোপ নাকি ‘কঠোর অবস্থান’ নিয়েছে এবং ট্রাম্পকে ‘পিছু হটতে’ বাধ্য করেছে। এটা নিছক আত্মতুষ্টি। ট্রাম্পের ‘একটি চুক্তির ধারণা’ আসলে কোনো ছাড় নয়। এটা ধোঁয়াশা ছড়ানোর আরেকটি কৌশল। এদিকে তিনি গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছেন—তা সে আইনগতভাবে হোক বা বাস্তবে।
ট্রাম্প এখনো স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডের ওপর ‘অধিকার, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ’ চান। উপরন্তু তিনি ইউরোপীয় নেতাদের বাধ্য করেছেন তাঁর উসকানিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে—এই যুক্তিতে ইউরোপকে সেখানে মার্কিন সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বাধ্য করাই তাঁর জন্য একধরনের বিজয়।
ইউরোপ ভাবছে, তারা ট্রাম্পকে চালাকি করে পিছু হটিয়েছে। আসলে তারা ট্রাম্পের মানসিক অস্থিরতা ও বিশ্বাসঘাতক স্বভাবকে ভীষণভাবে খাটো করে দেখছে।
জোর করে আদায় করা সম্মতিকে ট্রাম্প কোনো লক্ষ্য পূরণের উপায় হিসেবে দেখেন না। সেটাই তাঁর আনন্দের চূড়ান্ত রূপ। তিনি আনন্দ পান অন্যকে ভেঙে পড়তে দেখে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করে, তাতে তাঁর আনন্দ নেই। কারণ, তখন সেই ব্যক্তি নিজের মর্যাদা ধরে রাখে। কিন্তু জোর করে আত্মসমর্পণ করালে সেই মর্যাদা কেড়ে নেওয়া যায়। এ কারণেই ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তোষণনীতি ব্যর্থ হয়। কারণ, এতে তাঁকে এমন কিছু দেওয়া হয়, যা তিনি চানই না।
একটি চিন্তানিরীক্ষায় দেখানো হয়েছে—ধাপে ধাপে কীভাবে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারেন। নির্ভরশীলতা তৈরি করা, অর্থায়ন, সম্মতি তৈরি—সবই সংঘর্ষ ছাড়াই সম্ভব। ডেনমার্ক দাভোসের আগে সার্বভৌমত্ব বাদে প্রায় সবই দিতে চেয়েছিল। ট্রাম্প তাতেও রাজি হননি। সম্ভবত তাঁর কাছে ইউরোপের নতজানুতা এই দ্বীপের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
এই আচরণ শুধু ইউরোপের সঙ্গে নয়, নিজের সমর্থকদের সঙ্গেও তিনি একই রকম আচরণ করেন। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে জনস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। যাঁরা তাঁকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন, তাঁরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ট্রাম্পের কাছে অতীতের সমর্থনের কোনো মূল্য নেই। ভবিষ্যতের সম্পর্কের কথাও তিনি ভাবেন না।
কৃতজ্ঞতা তখনই অর্থবহ, যখন ভবিষ্যতে আবার দেখা হবে বলে বিশ্বাস থাকে। ট্রাম্প সেই জগতে বাস করেন না। তিনি যেন এমন এক খননকারী, যিনি একবার খুঁড়ে সব তুলে নিয়ে চলে যান।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ আমাদের একটি গভীর পার্থক্য দেখায়। এখানে আত্মসমর্পণ আদায় করা হয় তাৎক্ষণিক হুমকির মাধ্যমে। কিন্তু আনুগত্য গড়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। আত্মসমর্পণের জন্য শুধু এখন শক্তিশালী হওয়াই যথেষ্ট। আনুগত্যের জন্য ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস দরকার।
ট্রাম্প স্বেচ্ছাসহযোগিতার যুক্তি বোঝেন না। কারণ, তিনি ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস করেন না। তাহলে মিত্র গড়বেন কেন? আজকের প্রতিশ্রুতি কাল মানবেন কেন?
ন্যাটো এর পরিষ্কার উদাহরণ। ন্যাটোর মূল ভিত্তি একটি ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি। সংকট এলে সবাই একসঙ্গে দাঁড়াবে। ট্রাম্প এটাকে দেখেন চাঁদাবাজি হিসেবে। টাকা দিলেই নিরাপত্তা—এই তাঁর ধারণা। কিন্তু এমনকি চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও একটি প্রতিশ্রুতি থাকে। টাকা দিলে ক্ষতি হবে না। ট্রাম্প সেই প্রতিশ্রুতিও মানেন না।
ন্যাটোর নিয়ম মানা দেশগুলোর ওপরও শুল্কের হুমকি দেওয়া তার প্রমাণ। টাকা দিয়েও নিরাপত্তা কেনা যায় না। কেনা যায় শুধু এক মুহূর্তের অপমান।
দাভোসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে তাঁকে ‘ড্যাডি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। এরপর ট্রাম্প সাময়িকভাবে শুল্কের হুমকি তুলে নেন। কেউ কেউ একে বলেন ‘ট্রাম্প সব সময় পিছু হটে’। কিন্তু এটা পিছু হটা নয়। এটা নাটক। ট্রাম্প যা চেয়েছিলেন, সেটাই পেয়েছেন। সেটি হলো—সবার সামনে ন্যাটোর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা।
গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা আসলে ইউরোপবিরোধিতা নয়। এটা পারস্পরিক সম্পর্কের ধারণার বিরুদ্ধেই তাঁর অবস্থান। ট্রাম্পের কাছে ক্ষমতা সহযোগিতার বিকল্প।
ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা এখন বুঝছেন—এখানে কোনো সহযাত্রী নেই। আছে শুধু শাসক আর পদদলিত মানুষ। আদর্শিক মিলের কোনো মূল্য নেই। কারণ, পারস্পরিকতা ট্রাম্পের কাছে হুমকি।
ইউরোপের ডানপন্থীরা ভেবেছিলেন, তাঁরা একটি সম্পর্ক গড়ছেন। ট্রাম্পের চোখে সেখানে কিছুই গড়ার ছিল না। ছিল শুধু আত্মসমর্পণের স্বাদ।
আজ ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা যা বুঝছেন, ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকেরা এখনো তা বোঝেননি। তাঁরা বোঝেননি, ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে কিছুই পাওয়া যায় না। কারণ, নিজের আধিপত্যের প্রদর্শনী ছাড়া তাঁর কাছে বিক্রি করার মতো কিছু নেই।
স্টিফেন হোমস নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব লর অধ্যাপক এবং বার্লিনের আমেরিকান একাডেমির বার্লিন প্রাইজ ফেলো
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ