
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছে। যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তারাও নানা সময়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছে। কিন্তু এই প্রকাশ্য নিন্দার আড়ালে বাস্তব চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন।
যেসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে (বিশেষ করে আব্রাহাম চুক্তির স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো, পাশাপাশি জর্ডান ও মিসর), তারা তাদের মৌলিক সম্পর্কগুলো আগের মতোই বজায় রেখেছে। অর্থাৎ বাইরে যতই কঠোর ভাষা ব্যবহার হোক, ভেতরে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের কাঠামো বদলায়নি।
ফলে দেখা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আগের মতোই চলেছে, শুধু প্রকাশ্যে কিছুটা সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরব বিশ্বের এসব স্বাভাবিকীকরণকারী দেশের কেউই এমন কোনো কঠোর কূটনৈতিক বা আইনি পদক্ষেপ নেয়নি, যা ইউরোপের কিছু অ-আরব দেশ পর্যন্ত নিয়েছে। এমনকি ব্রিটেনও মানবাধিকার উদ্বেগের কারণে ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স আংশিকভাবে স্থগিত করেছে।
এর বিপরীতে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের ওপর কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক, আইনি বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেনি, যা তাদের সম্পর্কের কাঠামোকে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত।
এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। আরব রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ফিলিস্তিনকে বারবার ‘কেন্দ্রীয় ইস্যু’ বা ‘আরব বিশ্বের প্রধান বিষয়’ বলা হয়। আরব লিগের প্রায় সব নথিতেই এই বক্তব্য নিয়মিতভাবে থাকে। এমনকি অর্থনৈতিক বা পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনের ঘোষণাতেও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে গাজার সংকট ঘিরে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থানের কোনো মিল নেই। রাস্তায় মানুষ যতই প্রতিবাদ করুক, সরকারগুলোর নীতি অপরিবর্তিত থেকেছে।
আরব বিশ্বের গণমাধ্যমেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। সরকারি টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের আগ্রাসনের সমালোচনা করে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন বা মরক্কোর মতো দেশে এই আলোচনা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা প্রায় অনুপস্থিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেদের সরকারের নীতির সমালোচনা কার্যত নিষিদ্ধ।
আমি নিজেও টেলিভিশন আলোচনায় অংশ নিয়ে দেখেছি, কীভাবে এই বিষয়ে গভীর আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। আমি একটি লিবীয় টিভি চ্যানেলকে আরব বিশ্বের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তা হয়নি। কারণ হিসেবে আমাকে জানানো হয়, চ্যানেলটি জর্ডানভিত্তিক হওয়ায় এমন আলোচনা করলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমস্যা হতে পারে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল তুরস্কভিত্তিক আরেকটি চ্যানেলেও।
আরব দেশগুলোর হাতে ইসরায়েলের ওপর বিনিয়োগ প্রত্যাহার বা বাজারে প্রবেশ সীমিত করার মতো চাপ তৈরির মতো বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। আরব দেশগুলোর হাতে ইসরায়েলের ওপর বিনিয়োগ প্রত্যাহার বা বাজারে প্রবেশ সীমিত করার মতো চাপ তৈরির মতো বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।
উল্টোভাবে, বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্য বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত একাই ইসরায়েলে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পধাতু, যা ইসরায়েলের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে আম্মান, কায়রো বা কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় যখন মানুষ প্রতিবাদে উত্তাল, তখন সরকারগুলো কার্যত বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেছে।
এই পুরো পরিস্থিতি আরব বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আগে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব সরকারগুলো কিছুটা হলেও সতর্ক থাকত; কারণ, জনরোষের ভয় ছিল। কিন্তু এখন সেই সমীকরণ বদলে গেছে। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো জনমতকে নীতিনির্ধারণ থেকে কার্যত আলাদা করে ফেলেছে।
অনেক ক্ষেত্রে এই নজরদারি প্রযুক্তি এসেছে ইসরায়েলি কোম্পানির কাছ থেকেও। ফলে একদিকে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক প্রকল্প—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সরকারগুলো জন–অসন্তোষকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব ফেলতে দিচ্ছে না।
মিসর ও জর্ডানের মতো দেশে সীমিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তা কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। নির্দিষ্ট এলাকায় মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তাদের আবেগ সেখানেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যখনই সেই ক্ষোভ চুক্তি বাতিল বা সীমান্ত বন্ধের দাবির মতো নীতিগত পরিবর্তনের দাবি তোলে, তখনই নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে।
এর মধ্য দিয়ে বার্তাটি পরিষ্কার। তা হলো জনরোষ সহ্য করা যায়, কিন্তু তা রাষ্ট্রের কাঠামো বদলাতে পারবে না।
লিবিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। একসময় মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশটি সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে দেশটি কার্যত অকার্যকর। ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই।
সব মিলিয়ে গাজার যুদ্ধ আরব বিশ্বের এক গভীর দ্বৈততা প্রকাশ করেছে। একদিকে প্রকাশ্য নিন্দা, অন্যদিকে সম্পর্ক ও বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ।
আরব লিগের বিবৃতিগুলো অনেক সময় এমনকি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব অবস্থানের চেয়েও বেশি কঠোর শোনায়, যা সংগঠনটির দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
এই বাস্তবতা দেখায়, কীভাবে রাষ্ট্রগুলো জনগণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখছে।
এই নীতি হয়তো স্বল্প মেয়াদে স্থিতিশীলতা দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি এক গভীর নৈতিক সংকট তৈরি করছে। কারণ, জনমত ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে এত বড় ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
গাজার ট্র্যাজেডি তাই শুধু যুদ্ধের গল্প নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক গভীর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি—যেখানে নিন্দা আছে, কিন্তু বাস্তবে চলছে ব্যবসা; আর নৈতিকতার জায়গা দখল করছে কৌশলগত স্বার্থ।
মুস্তাফা ফেতৌরি লিবিয়ার একাডেমিক ও স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস’ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।