২৫ বছর আগে নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা ঘটে। যার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে।
২৫ বছর আগে নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা ঘটে। যার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে।

মতামত

৯/১১ পরবর্তী ‘ওয়ার অন টেরর’র ধাক্কা আমেরিকা এখন টের পাচ্ছে কি

৪০ বছরের বেশি বয়সী অন্য সব মার্কিন নাগরিকের মতো আমারও মনে আছে, যখন ৯/১১ হামলার খবর পাই, তখন আমি কোথায় ছিলাম। আমি গাড়ি চালিয়ে অফিসে যাচ্ছিলাম, রেডিওতে ‘ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও’ শুনছিলাম।

অফিসে পৌঁছানোর পর দেখলাম লোকজন স্তব্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ কাঁদছিল। অন্যরা কম্পিউটার মনিটরের চারপাশে জড়ো হয়েছিল। প্রতিটি স্ক্রিনে বারবার একই দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল—টাওয়ার দুটিতে বিমান আছড়ে পড়ছে, কিছু মানুষ শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, টাওয়ারগুলো ধসে পড়ছে, ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপের মেঘ উড়ছে।

তখনো কেউ খুব বেশি কিছু জানত না। আল-কায়েদা তখন পর্যন্ত তেমন পরিচিত ছিল না। ওসামা বিন লাদেনের দলই যে এই হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের কয়েক দিন সময় লেগেছিল। কিন্তু সেই প্রথম স্তব্ধ মুহূর্তগুলোতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল—এ ঘটনা আমাদের পৃথিবীকে বদলে দেবে, আর তা মোটেও ভালোর জন্য নয়।

প্রায় ২৫ বছর পর সেই ক্ষতির পরিমাপ করা এখন সহজ। এ হামলা মার্কিন বৈশ্বিক নেতৃত্বের পতনের সূচনা করেছিল। এটি আমাদের স্থায়ী ভয় ও জরুরি অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। এটিই পরবর্তী সময়ে আমাদের গণতন্ত্রের দ্রুত পতনকে ত্বরান্বিত করে।

৯/১১-এর ঘটনা বা সামগ্রিকভাবে আল-কায়েদা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এর অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারত এবং কাটিয়ে উঠেছিলও। একটি বিশাল দেশের বাস্তব পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে যে দেশে প্রতিবছর সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, সেখানে ৯/১১-এ ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও তা দেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো ছিল না। আমাদের অনুমেয় অতি প্রতিক্রিয়াই আসলে আমাদের ধ্বংস ডেকে এনেছে।

৯/১১-এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে আক্রমণ করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় ২০ বছর দীর্ঘ এক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে ৬ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্যের প্রাণ কেড়ে নেয়। হামলার ছয় সপ্তাহ পর কংগ্রেস ‘ইউএসএ পেট্রিয়ট অ্যাক্ট’ পাস করে। এর মাধ্যমে সরকারি নজরদারি ও আটকের ক্ষমতা এমনভাবে বাড়ানো হয়, যা আগে ভাবাও যেত না।

হামলার ছয় মাসের মধ্যে বুশ একটি নির্দেশিকায় সই করেন, যেখানে বলা হয়, আল-কায়েদার সঙ্গে সংঘাতে ‘জেনেভা কনভেনশন’ প্রযোজ্য হবে না। এর এক বছর পর আমরা ইরাকেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। সে সময় সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং তিনি আল-কায়েদাকে সাহায্য করছেন বলে মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল। সেই যুদ্ধেও ৮ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হন।

২০০৪ সালের শেষের দিকে, ৯/১১-এর পর আমেরিকার প্রতি বিশ্বজুড়ে যে সহানুভূতির জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা উবে যায়। এর অন্যতম কারণ ছিল লাশের পাহাড়। ইরাক, আফগানিস্তান এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের অন্যান্য দূরবর্তী ঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সেনা নিহতের পাশাপাশি লাখ লাখ আফগান ও ইরাকি নাগরিক মারা যান। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা এবং নির্যাতনের অনুমোদন দিয়ে বুশ প্রশাসন নৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানও হারিয়েছিল। মার্কিন সেনাদের হাতে ইরাকি বন্দীদের নগ্ন করে মানুষের পিরামিড বানানোর ছবি যাঁরা একবার দেখেছেন, তাঁরা তা সহজে ভুলতে পারেননি।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেন

তবে বুশ ক্ষমতা ছাড়ার পরও এই আত্মঘাতী ক্ষতি থামেনি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বুশ প্রশাসনের অনেক চরম নীতি, যেমন নির্যাতন বন্ধ করেছিলেন, কিন্তু এই ‘অনন্ত যুদ্ধ’ শেষ করা কঠিন ছিল। ওবামা স্বীকার করেছিলেন যে শুধু একের পর এক সন্ত্রাসী মেরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু তা–ও তিনি থামতে পারেননি।

তিনি বিশ্বজুড়ে ড্রোন হামলা এবং সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের টার্গেট করে হত্যার পরিধি বাড়ান। বুশ প্রশাসনের নির্যাতনের মতোই, এই টার্গেট কিলিং কর্মসূচিতে কোনো আইনি প্রক্রিয়ার বালাই ছিল না, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের আমলেও চলেছে। নির্বাহী বিভাগ দাবি করেছিল যে গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে তারা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, যেকোনো মানুষকে হত্যা করার অধিকার রাখে এবং সেই প্রমাণ তারা প্রকাশও করবে না। অর্থাৎ সরকার নিজেই বিচারক, জুরি ও জল্লাদ সেজে বসেছিল।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যখন একটি সহিংস ডানপন্থী দল ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায়, ততক্ষণে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো উগ্র ও খুনি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ছিল না। বড় হুমকি ছিল আমাদের নিজস্ব নাগরিকেরা, যাদের উসকে দিয়েছিলেন একজন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট, যাঁর হাতে আমরাই বিশাল ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলাম।

৯/১১-এর ধাক্কা দেশের ভেতরেও লেগেছিল। ২০০১ সালের পেট্রিয়ট অ্যাক্ট ছিল কেবল শুরু। নজরদারি ও আটকের ক্ষমতা বাড়তেই থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে তৈরি হওয়া নজরদারি প্রযুক্তি পরবর্তী সময়ে ফেডারেল, রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশ ব্যবহার করা শুরু করে। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া আইনি নীতিগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় প্রয়োগ হতে থাকে। একটি নিষ্ক্রিয় কংগ্রেস নির্বাহী বিভাগের কাছে ক্রমাগত ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ায়, ৯/১১-এর পর দেওয়া ‘জরুরি’ ক্ষমতাগুলো স্থায়ী রূপ নেয়।

এর চেয়েও ক্ষতিকর বিষয় হলো, আমেরিকা ভয় ও পারস্পরিক সন্দেহের এক জাতিতে পরিণত হয়। ৯/১১-এর আগে মার্কিন নাগরিকদের মনে যে অভেদ্যতার অনুভূতি ছিল, তা ভেঙে যাওয়ার পর তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। ইসলামবিদ্বেষ ও বিদেশিবিদ্বেষ বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে—যেমন, এই হামলা ছিল ভেতরেরই কোনো কাজ কিংবা ইসরায়েলের চক্রান্ত, অথবা ওয়াল স্ট্রিটের এলিটদের পরিকল্পনা, যারা এর মাধ্যমে মুনাফা লুটেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ে। ২০১৪ সালের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের বেশি ডেমোক্র্যাট এবং এক-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকান অন্য রাজনৈতিক দলকে ‘দেশের মঙ্গলের জন্য হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। চরমপন্থী ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো শক্তি সঞ্চয় করে।

অবশ্য আমেরিকার গণতন্ত্রের পতনের একমাত্র কারণ ৯/১১ ছিল না। তবে এটি এমন আইনি, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা পতনকে ত্বরান্বিত করে। ২০১৫ সালের মধ্যে নিউইয়র্কের এক রিয়েলিটি শো তারকা যখন ক্ষমতায় আসতে শুরু করেন, তখন আমাদের দেশ ভেতর থেকেই একজন স্বৈরাচারী শাসকের কবজায় যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। অভ্যন্তরীণ বিভাজনে দুর্বল এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনি নিয়ম লঙ্ঘনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া একটি দেশের গণতন্ত্র হোয়াইট হাউসের একজন স্বৈরাচারীর সামনে কীভাবেই-বা টিকে থাকবে?

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যখন একটি সহিংস ডানপন্থী দল ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায়, ততক্ষণে এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো উগ্র ও খুনি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ছিল না। বড় হুমকি ছিল আমাদের নিজস্ব নাগরিকেরা, যাদের উসকে দিয়েছিলেন একজন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট, যাঁর হাতে আমরাই বিশাল ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলাম।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার কলোনিস্ট বা উপনিবেশবাদীরা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। আমেরিকার ২৫০তম জন্মবার্ষিকীর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আজ যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার দিকে তাকাই, তখন মনে হয়, ম্যাড কিং জর্জ যেন দূর থেকে আমাদের দেখছেন আর হাসছেন।

  • রোসা ব্রুকস জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক। ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত।