শীত নিবারণে আগুন পোহাচ্ছেন কয়েকজন। চট্টগ্রামের খুলশীর আমবাগান এলাকায়
শীত নিবারণে আগুন পোহাচ্ছেন কয়েকজন। চট্টগ্রামের খুলশীর আমবাগান এলাকায়

মতামত

আপদমুক্ত শীতের জন্য প্রার্থনা

বাংলাদেশের শীতের জন্য উত্তরের পাখিরা মুখিয়ে থাকে। সাইবেরিয়ার যম ঠান্ডা থেকে অনেক অনেক কম ঠান্ডার সন্ধানে তারা চলে আসে। ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়, তারপর আবার ফিরে যায়। তত দিনে সেখানকার যম ঠান্ডা ফিকে হয়ে আসে। যম ঠান্ডা থেকে বাঁচতে এ দেশে এসে কাঙ্ক্ষিত উষ্ণতার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরা পায় অঢেল খাবার। খালবিল তাদের পানি কমিয়ে মাছ সহজলভ্য করে তোলে। অগ্রহায়ণে ধান কাটার পর মাঠেও মেলে ছিটিয়ে থাকা ধান।

পাখিদের মতো অভিবাসী (রেমিট্যান্স সৈনিক ছাড়া) দেশি মানুষদের অনেকে শীতের ছুটিতে দেশে আসার টিকিট কাটে। ঝড়বৃষ্টি আর ‘অসহ্য গরম’মুক্ত বাংলাদেশ দেখে যান বছরে পাঁচ বছরে একবার। তাঁদেরও অনেকে চিকন কটাক্ষ করে ‘শীতের পাখি’ ডাকেন। পিঠা উৎসব, পুষ্প প্রদর্শনী ইত্যাদি নানা উপচারে উপচে পড়ে মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের আনন্দের ডালি। শীত এলেই অনেকে বুঝতে পারেন শরীরে মেদ জমেছে, আগের কোটের বোতাম লাগছে না। সোয়েটার ফাঁস করে দিচ্ছে ভুঁড়ির অবস্থান।

কিন্তু নানা সবজিতে সাজানো শীতটা সবার জন্য সুখের বার্তা নিয়ে আসে না। অনেক পীড়িত প্রবীণ শীতে আর ‘টিকতে’ পারেন না। নবজাতক আর হাঁটতে শেখা শিশুদের টিকে থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। লঞ্চ দুর্ঘটনা, অগ্নিদুর্ঘটনার খবরে সয়লাব হয়ে যায় গণমাধ্যম। প্রান্তিক শিশুরা মায়ের আঁচলের উষ্ণতা আর গরম ভাত ফেলে চলে যায় ভাতের খোঁজে ইটভাটায়, শুঁটকিপল্লিতে। কেউ ফেরে আর কেউ ফেরে না।

শীতের সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপ করা নানা খবর আসতে থাকে চারদিক থেকে। ঘন কুয়াশায় লঞ্চের সঙ্গে লঞ্চের সংঘর্ষ, বাল্কহেডের সঙ্গে অন্যান্য জলযানের সংঘর্ষ, যাত্রীবাহী জলযানের দিক হারানো, ফেরি চলাচল বন্ধ; আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে স্থবিরতা এসব খবরের পাশাপাশি আসতে থাকে আগুন পোহাতে গিয়ে মানুষের মৃত্যুর খবর। এদের অধিকাংশ থাকে প্রবীণ নারী অথবা শিশু। এবার শীতের শুরুতেই নিজের বিছানায় পুড়ে মারা গেলেন প্রবীণ কামরুন নাহার (৮৫)। তিনি তাঁর ঘরে একাই থাকতেন। শীত তাড়াতে ঘরে মাটির মালসায় জ্বালানো আগুন থেকেই এই শরীরপোড়া আগুনের সূত্রপাত।

শরীয়তপুরের সদরে রুদ্রকর ইউনিয়নের রুদ্রকর এলাকার এ ঘটনা আরও অনেক জায়গায় ঘটেছে ঘটতে পারে। গত শীতে সারা দেশে এ রকম একা প্রবীণার আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল মোট ২৪টি। এটা শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মৃতদের খবরের হিসাব। অনেকেই আগুনে পুড়ে হাসপাতালে আসেন, বেঁচে যান কেউ কেউ। সেগুলো আর খবর হয় না। বার্ন ইউনিটে রোগীর চাপ সারা বছরই থাকে, তবে শীতে চাপ থাকে বেশি। এ জন্য প্রস্তুতিও নিতে হয় আলাদা করে। ২০২৩ সালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সেবা নেওয়া মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার ৬২৫। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ রোগীই ছিলেন শীতকালের (অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ)।

বার্ন ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে বেশি পুড়ছেন নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা। শাড়িতে আগুন লাগার মুহূর্তে টের পাওয়া যায় না। যতক্ষণে পাওয়া যায়, ততক্ষণে শরীরের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে চাদর বা কম্বলে আগুন লাগে। অন্যদিকে গরম পানিতে শিশুরা পুড়ছে বেশি। বিষয়টি নিয়ে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি প্রকল্পগুলোর তদানীন্তন সমন্বয়কারী অধ্যাপক সামন্তলাল সেনকে সেই বছর প্রশ্ন করলে, তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও কেস স্টোরির আলোকে জানিয়েছিলেন, গোসল করার সময় গরম পানি পাতিলে করে গোসলখানায় নিতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ পানি বালতিতে করে নিয়ে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।

ডায়রিয়া আর শ্বাসযন্ত্রের জটিলতায় শিশুরা ভুগছে বেশি

শীতে শিশুরা ডায়রিয়া ছাড়াও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত সমস্যা সর্দিকাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গলাব্যথা, টনসিলাইটিস, সাইনোসাইটিস, ল্যারিঞ্জাইটিসে প্রভৃতি রোগে ভুগে থাকে। এবার তার ব্যতিক্রম হয়নি।  সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত সারা দেশে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৯ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬৮৩ জন ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৪৬ জন।

দেশের কোন অঞ্চলে সংকট বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর—এই ছয় জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে নরসিংদীতে, ৪ হাজার ১৩৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১ হাজার ২৯৩ জন, কক্সবাজারে ১ হাজার ১৩৯ জন, সিলেটে ১ হাজার ১৩৪ জন এবং চাঁদপুরে ৭৫৭ জন।

ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৬৫৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৮৬০ জন, কক্সবাজারে ৩ হাজার ২৮২ জন, নরসিংদীতে ২ হাজার ৩৩৯ জন এবং সিলেটে ২ হাজার ২০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

শীত আসে শীত যায় আমরা শুধু মৃতদেহের সাক্ষী হই। কিছু কিছু সাধারণ পদক্ষেপ নিলেই ঝুঁকি আর মৃত্যু দুটিও কমিয়ে আনা যায়।

এখানে শীতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপগুলোর কিছু সুপারিশ দেওয়া হলো। যদিও এগুলো নতুন কিছু নয়, তবু চর্চা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।  

শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য করণীয়

• সদ্যোজাত শিশুদের ও মাকে ঠান্ডা পানিতে গোসল করানো যাবে না।
• শিশুদের হাত ও পায়ে মোজা, গায়ে সোয়েটার ও মাথায় টুপি এবং পরিষ্কার কাপড় পরাতে হবে।
• জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুকে বাড়ির বাইরে নেওয়া যাবে না।
• ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
• ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার খাওয়াতে হবে।
• প্রয়োজনে শিশুকে হালকা গরম পানি দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গোসল করাতে হবে।
প্রবীণদের সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে করণীয়
• প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া।
• সব সময় গরম কাপড় পরা।
• নাক ও মুখ ঢেকে রাখা যেন ফুসফুস ধুলাবালুমুক্ত থাকা যায়।
• অতিরিক্ত পরিশ্রম না করা।
• মেঝেতে না ঘুমানো।
• খালি পায়ে চলাচল না করা।
• কাপড় এমনভাবে পরা যেন শরীর তাপ ধরে রাখতে পারে।
• সব সময় পরিষ্কার কাপড় পরা।
নিচে লেখা লক্ষণগুলো দেখা দিলে অতিসত্বর শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
• শ্বাসকষ্ট, কাশি, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস নিলে ও খিঁচুনি দেখা দিলে।
• হঠাৎ করে শিশু বুকের দুধ ও তরলজাতীয় খাবার না খেলে।
• শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় দ্রুত বুক ওঠানামা করলে ও শিশু বমি করলে।
• শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা হয়ে গেলে অথবা শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে।

শীতের সময় আগুন পোহাতে সতর্কতা

১. এ ক্ষেত্রে নারীরাই বিপদে পড়ে থাকে বেশি। গ্রামাঞ্চলে নারীরা সাধারণত শাড়ি পরেন। হাড়কাঁপানো শীত সহ্য করতে না পেরে বাড়ির পাশেই খড়ের মধ্যে আগুন ধরিয়ে তাপ নেওয়ার সময় কখন যে শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়, তা শীতের তীব্রতার কারণে বোঝা যায় না। এ ক্ষেত্রে শাড়ি ভালোভাবে পেঁচিয়ে তারপর বসুন।

২. অতীতে দেখা গেছে, শীতের মধ্যে এলাকার ছেলেরা কয়েকজন মিলে কৃষকের খড়ের পুঞ্জির পাশে আগুন পোহাতে গিয়ে সেই পুঞ্জি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কৃষকের জন্য এ ক্ষতি অপূরণীয়। কৃষকের খড় যেখানে আছে তার থেকে দূরে আগুন পোহালে ভালো, যদি সম্ভব হয় তাহলে আশপাশে কৃষকে খড় বা কারও বাড়ি নেই এমন স্থানে আগুন পোহানো।

৩. আগুন পোহানো হয়ে গেলে আগুন ভালোভাবে নিভিয়ে দিন। না হয় অজান্তে কেউ সেখানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।  

৪. যাঁরা বারবিকিউ পার্টি করছেন, যতটা সম্ভব সাবধানে থাকুন। নিশ্চিত হোন আপনার ফায়ার প্লেসের আগুন পুরোপুরি নিভেছে কি না। সামান্য আগুনের ফুলকি থেকেও বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।  

৫. বাড়ির ছোট সদস্যদের প্রতি বাড়তি নজর দিন। আগুন থেকে দূরে রাখুন। প্রয়োজনে বাড়তি গরম কাপড় পরিয়ে রাখুন।  

মনে রাখতে হবে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু অপবিত্র নয়, তাকে তাড়াহুড়ো করে এই শীতে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করানো মানে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। যেসব প্রবীণ নারী একা থাকেন তাঁদের এই শীতে বিশেষ খেয়াল রাখা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক wahragawher@gmail.com