ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে এক শিক্ষাথী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে এক শিক্ষাথী।

মতামত

নারীর উন্নয়নে সবার আগে দরকার নিরাপত্তা কার্ড

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে প্রথম যে অঙ্গীকারটি করেছিল তা হলো, দেশের ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে অসচ্ছল ও প্রান্তিক পরিবারের নারীরা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে আর্থিক সহায়তা পাবেন। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করার কথাও ইশতেহারে বলা হয়েছে।

সরকার গঠনের ২১ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সরকার গঠনের এক মাসের কম সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার উদাহরণ খুব একটা নতুন নয় আমাদের কাছে। তাই নবগঠিত সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের এই সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর এই উদ্যোগ সত্যিই নারীর ক্ষমতায়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে তো? নাকি এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে নারীকে আরও বেশি প্রান্তিক ও পরনির্ভরশীল করে তুলবে এবং বৃদ্ধি করবে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন?

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন সমগ্র বাংলাদেশে তিনি নারীদের স্কুল পর্যায় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা বিনা মূল্যে করার ব্যবস্থা করেছেন। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে আজ আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে চাই, অর্থনৈতিকভাবে তাদের সচ্ছল করতে চাই।’

আমরা জানি শিক্ষার সঙ্গে মানুষের স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা অর্জনের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসারে বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা আমাদের জানা। তিনি নব্বইয়ের দশকে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। শুধু তাই নয়, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনা ও উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করেন।

নারী শিক্ষার প্রসারে বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া উদ্যোগগুলো পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। ফলে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। শুধু তাই নয়, ফলাফলের মানদণ্ডেও পুরুষদের পেছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন নারী। প্রশ্ন হলো শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কেন নারীরা আজও স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারল না? নারীশিক্ষায় এত বিনিয়োগের পরও কেন আজ সরকারকে নারীর ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রচলন করতে হচ্ছে?

বাংলাদেশের প্রত্যেক নারী ও মেয়েশিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমতা নিশ্চিত করতে হবে

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা কঠিন নয়। শিক্ষার সুফল কখনোই পাওয়া যাবে না যদি রাষ্ট্র নারীকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো নিরাপত্তার অভাব। গণপরিবহনে, খোলা রাস্তায়, মাঠে ময়দানে, অলিতে-গলিতে, স্কুল-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে, হাসপাতালে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, গণমাধ্যমে, এমনকি লাশঘরে পর্যন্ত নিরাপত্তা নেই নারীর। এ ছাড়া পারিবারিক নির্যাতন তো আছেই।

বাল্যবিবাহ আজও এ দেশের প্রধানতম সামাজিক সমস্যা। বাংলাদেশে প্রতি দুজন নারীর মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে যায় আঠারো বছর পূর্ণ করার আগেই। অথচ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কোনো প্রতিশ্রুতি চোখে পড়েনি। ৭০ শতাংশ নারী এ দেশে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়। বাংলাদেশ যেন নারী ও শিশু ধর্ষণের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বেড়েছে নারীর প্রতি মোরাল পুলিশিং বা নৈতিক পুলিশিংয়ের ঘটনা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে গত এক বছরে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।

ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন বলছে, শুধু এক বছরেই বাংলাদেশের প্রায় ৩৩ লাখ নারী প্রযুক্তির মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরও নারীর প্রতি নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের ঘটনা কিছুমাত্র কমেনি। নারীর প্রতি সহিংসতার চূড়ান্ত এই দেশে কীভাবে নারী উন্নয়নের মূল স্রোতোধারায় শামিল হবে?

ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া আর্থিক সাহায্য নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজে উপার্জন করার পরও নারী তা খরচের জন্য পুরুষের সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী, সেই সমাজে ফ্যামিলি কার্ডের সুফল যে নারী ভোগ করবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এ ছাড়া আরেকটি ঝুঁকির দিক হলো, ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ হস্তগত করতে বাড়তে পারে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন। এ ধরনের উদ্যোগের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো, বিনাশ্রমে অর্জিত অর্থ মানুষকে সাধারণত পরনির্ভরশীল করে তোলে। তাই প্রয়োজন উন্নয়নের মূল স্রোতোধারায় নারীকে সক্রিয় করার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। এ ছাড়া প্রয়োজন আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ এবং নারী নির্যাতনের বিপক্ষে সরকারের শূন্য-সহিষ্ণু অবস্থান।

বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে লেখাপড়া করাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে শিক্ষায় শুধু নারীর অংশগ্রহণ বাড়ালে হবে না; বরং একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে নারীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও অবাধে চলাচলের নিশ্চয়তা। চাই ঘরে-বাইরে নারীর নিরাপত্তা। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া না হলে দেশের উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

নারীর হাতেই আছে বাংলাদেশের উন্নয়নের ট্রাম্পকার্ড। আর সেই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নারীর নিরাপত্তা। এই মুহূর্তে ফ্যামিলি কার্ডের চেয়েও যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো হলো নারীর নিরাপত্তা; যা একমাত্র সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপই নিশ্চিত করতে পারে। নারী চায় রাষ্ট্র তার জন্য নিরাপত্তার এক অদৃশ্য বলয় সৃষ্টি করুক; যার মধ্যে বাস করে নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দৃপ্ত পদক্ষেপে পৌঁছে যাবে উন্নয়নের কক্ষপথে।

  • নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী

    ই-মেইলঃ purba_du@yahoo.com

  • (মতামত লেখকের নিজস্ব)