অভূতপূর্ব গণজাগরণে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিজয় উদ্‌যাপন। ৫ আগস্ট ২০২৪, সংসদ ভবন এলাকায়
অভূতপূর্ব গণজাগরণে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিজয় উদ্‌যাপন। ৫ আগস্ট ২০২৪, সংসদ ভবন এলাকায়

মতামত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: বাস্তবতা, প্রচার ও অপপ্রচার

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যান্য আন্দোলন-সংগ্রামের মতো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও স্বীকৃত সত্য হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আমাদের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের পর বড় গণ–আন্দোলন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থান।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। কোনো বিশেষ দলের নেতৃত্বে হয়নি বলেই সব মত-পথের লাখো মানুষ এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, দলীয় কর্মসূচিতে শুধু সেই দলের সমর্থকদেরই অংশগ্রহণ থাকে, সে আন্দোলন কখনো সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দলমত-নির্বিশেষে দেশের আপামর মানুষের একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কিন্তু কেন দেশের আপামর মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ? কারণ একটিই। তারা পনেরো বছর ধরে নানা অন্যায় প্রক্রিয়ায় শাসনক্ষমতা দখলে রাখা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের অপশাসনের অবসান চেয়েছিল।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে তাঁর ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন। এই ব্যক্তিগত বাহিনীর না ছিল কোনো নীতি, না ছিল কোনো আদর্শ। এই বাহিনীর একমাত্র কাজ ছিল নেত্রীর জয়ধ্বনি করা, আর নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা।

দল থেকে পুরোনো ত্যাগী নেতা-কর্মীরা উৎখাত হয়ে গিয়েছিলেন, বিভিন্ন পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি তাঁর পছন্দমতো আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলছিলেন এবং তাঁর একান্ত বশংবদদের দলের বিভিন্ন পদে বসিয়ে দলটিকে পুরোপুরি নিজের হাতে রেখেছিলেন।

সার্বিক অর্থে শেখ হাসিনা যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যে আওয়ামী লীগের সরকার চালিয়েছেন, সেটি ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের উত্তরসূরি ছিল না, সেটি ছিল হাসিনার আওয়ামী লীগ।

সর্বত্র নিজের লোক বসিয়ে এমন এক অনুকূল অবস্থা গড়ে তুলে শেখ হাসিনা পনেরো বছর একচ্ছত্রভাবে দেশ শাসন করে গেছেন। তিনি পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরশাসকে। সব স্বৈরশাসকের মতো তিনিও সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না। তিনিও স্তুতি ও স্তাবকতা পছন্দ করতেন। পরপর তিনবার শেখ হাসিনা নির্বাচনের নামে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন। নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট হয়ে যাওয়ার অভিনব দৃষ্টান্তও স্থাপন করে গেছেন।

বিক্ষোভকারীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। ৩ আগস্ট ২০২৪, ঢাকা

স্বৈরশাসকদের যে পরিণতি ইতিহাস লিখে রেখেছে, হাসিনাকেও সেই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। দেশের কোটি মানুষ যখন রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন তাকে পালাতে হয়েছে; দলবলসহ পালাতে হয়েছে। চব্বিশের জুলাই মাসে এসে দেখা গেল, পনেরো বছর ধরে দেশ শাসন করা এই সব রাজনীতিবিদের পায়ের তলায় মাটি নেই, সাধারণ জনগণের সঙ্গে তাঁদের বিরাট দূরত্ব।

আজ যখন শেখ হাসিনার সমর্থকেরা তাঁর পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করছেন, তাঁর উন্নয়নের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করছেন, তাঁরা কিন্তু বলছেন না সে আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার কথা, বলছেন না ব্যাংকিং খাতে অরাজকতার কথা, বলছেন না বিরোধীমহলের ভিন্নমত দমন করা, গুম-খুন জেল-জুলুম মামলা-হামলার কথা। কেবল কার্টুন আঁকার জন্যই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে শিল্পীকে। লেখককে কারাগারের ভেতর জীবন দিতে হয়েছে।

যেকোনো স্বৈরাচারের ধর্মই হচ্ছে প্রচণ্ড দমননীতি চালিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন মনোযোগ দেওয়া। পাকিস্তান আমলের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানও এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। হাসিনার শাসনামলে তো স্পষ্টই বলা হয়েছে, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র।

শেখ হাসিনার সমর্থকেরা, আজও যাঁরা তাঁর পক্ষে কথা বলছেন, তাঁরা এসব বিষয়কে হয় ইচ্ছাকৃতভাবে নয়তো অজ্ঞতাবশত উপেক্ষা করে চলেছেন। দেশের মানুষ শেখ হাসিনার দুঃশাসন মেনে নিতে পারেনি। ভেতরে-ভেতরে বারুদ জমে ছিল, জুলাই মাসে তা বিস্ফোরিত হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে হাসিনা-সমর্থকেরা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থান হিসেবে প্রচার করে যাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর ইন্ধন রয়েছে। যাঁরা বলছেন, তারা চিন্তা করে দেখছেন না, আন্দোলনে অংশ নেওয়া লাখ লাখ মানুষ যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হয়, তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক কারা? কেবল হাসিনা-সমর্থকেরা?

এটা স্পষ্টতই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে হাসিনা-সমর্থকদের অপপ্রচার। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটা আন্দোলনের ক্ষেত্রেই যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, তাদের এমন অপপ্রচার করতে দেখা গেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে ‘ভারতীয় অনুচরদের’ কাজ বলা হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী ভারতীয় দালাল’ বলা হয়েছে। সেই একই ধারায় শেখ হাসিনার সমর্থকেরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ কাজ বলে অভিহিত করে যাচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি দারুণ স্পর্শকাতর বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের কোনো অবমাননা তারা কখনো মেনে নেয় না। তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে রাজনীতি করাকেও তারা মেনে নেয় না। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের সমর্থকেরা যখন নিজেদেরই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র রক্ষক হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন মানুষ তাঁদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তাদের বিরোধিতা করার অর্থ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তথাকথিত আওয়ামী-মহলের বিরোধিতা।

শেখ হাসিনার সমর্থকেরা জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীকে দেখছেন; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পুরো আন্দোলনের সময় জামায়াতের নাম শোনা যায়নি, তাদের কোনো বক্তব্য কিংবা আন্দোলনের কোনো কর্মসূচি দেখে কেউ আসেনি। যেহেতু কোনো দলের নেতৃত্ব বা সম্পৃক্ততা এই আন্দোলনে ছিল না, তাই সব দল-মতের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল হাসিনা শাসনের অবসান ঘটানো। জনগণ গুলির সামনে পিছু হটেনি, বুক পেতে দাঁড়িয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্যের পর আন্দোলনে নেতৃত্বদানের দাবিদার কিছু তরুণ এনসিপি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। এমন আরও কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছিল অভ্যুত্থানের পর। রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে একমাত্র এনসিপি। দলটি নির্বাচনী জোটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের সহযোগী হিসেবে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরেছে।

সার্বিক বিবেচনায় এ কথা নিশ্চয় বলা যাবে না যে এনসিপি জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া লাখো জনতার সবাইকে প্রতিনিধিত্ব করে। বরং বলা সংগত যে আন্দোলনকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশই তাদের সঙ্গে রয়েছে।

আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হাত মেলালেও এ কথা বলার সুযোগ নেই যে জুলাইয়ের ইতিহাস সৃষ্টিকারী অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব জামায়াতে ইসলামীর। বলার সুযোগ নেই যে এই আন্দোলনে স্বাধীনতাবিরোধীদের অভ্যুত্থান ঘটেছে। বরং এই সত্যকে স্বীকার করে নিতে হবে যে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপামর মানুষের রুখে দাঁড়ানো, তাদের লড়াকু চেতনা ও আত্মত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল একটি আন্দোলন। এ কথা অনস্বীকার্য যে মুক্তিযুদ্ধের পরই এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

  • মনজুর আহমদ নিউইয়র্ক প্রবাসী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

    মতামত লেখকের নিজস্ব