
পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মধ্যে ইরানের রাজনৈতিক রূপান্তরকে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা থেকে আমদানি করা ধারণা ও শ্রেণিবিভাগের আলোকে ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা বারবার দেখা যায়। যেমন ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি ‘তৃতীয় প্রজাতন্ত্রে’ প্রবেশ করছে—এমন ধারণা ফরাসি প্রজাতন্ত্রগুলোর ধারাবাহিক পরিবর্তনের মতো একটি বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দেয়। আরও সমস্যাজনক হলো, এই কাঠামো ইরানে ক্ষমতার প্রায় বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের একটি প্রাচ্যবাদী ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করে।
প্রথম পর্যায়টি চিহ্নিত হয়েছিল ইসলামি বিপ্লব, ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং ‘ওয়ালিয়াত আল–ফাকিহ’; অর্থাৎ ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব বা শাসনব্যবস্থাভিত্তিক একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে। এই কাঠামোর মধ্যে একই সঙ্গে বিপ্লবকে সংরক্ষণ, দেশের ভূখণ্ড রক্ষা এবং বিপ্লবের নীতিগুলোকে এমন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা জরুরি ছিল, যা বিপুল বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির উত্থানের মধ্য দিয়ে। এ সময় ইরান কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা একটি বিপ্লব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সুসংহত করেছে।
এই সময়েই গড়ে উঠতে শুরু করে পরবর্তীকালে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো। এতে এমন বিভিন্ন আন্দোলন ও শক্তি যুক্ত ছিল, যেগুলোর জাতীয় ও মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরোধিতায় তাদের অবস্থান ছিল অভিন্ন।
তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হচ্ছে এখন, আরও নাটকীয় পরিস্থিতিতে—যুদ্ধের মধ্যেই নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনির শাহাদাত এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির উত্থানের পর।
সাম্প্রতিক সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বে পরিবর্তনগুলো থেকে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর সংঘাত থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলোকে ইরান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বাসিজ গণসংগঠন এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নিয়োগ থেকে কমান্ড কাঠামোর অধিকতর কেন্দ্রীকরণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার, অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট প্রস্তুত করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গাজা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কোনো প্রান্তিক ইস্যু নয়। ফিলিস্তিন এখনো সেই রাজনৈতিক ও প্রতীকী উপাদানগুলোর অন্যতম, যা এই আঞ্চলিক কাঠামোকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
সংবেদনশীল বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে আইআরজিসির নৌবাহিনীতে অভিজ্ঞ কমান্ডারদের নিয়োগ অতিরিক্ত গুরুত্ব বহন করে এমন এক সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালি আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নেতৃত্বের গ্রহণ করা ভাষা ও অবস্থান। ইরানের প্রচলিত ‘কৌশলগত ধৈর্যের’ নীতি যেন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিরোধক্ষমতার একটি মতবাদকে জায়গা করে দিচ্ছে, যার সঙ্গে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কথাও স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই রূপান্তরের অর্থ এই নয় যে ইরান তার কৌশলের আঞ্চলিক মাত্রা পরিত্যাগ করে কেবল নিজস্ব সীমান্ত রক্ষাকেন্দ্রিক নীতির দিকে এগোচ্ছে। বরং এখানেই ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বজায় রয়েছে।
সম্প্রতি হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং বহির্বিশ্ববিষয়ক রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান বাসেম নাইম বলেছেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই যে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা হামাস ‘গভীর আগ্রহের সঙ্গে’ গ্রহণ করেছে।
এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে যদি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ আঞ্চলিক কৌশলগত গভীরতা তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে তৃতীয় পর্যায়ে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষ সংঘাতের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই কাঠামোর মধ্যে গাজা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কোনো প্রান্তিক ইস্যু নয়। ফিলিস্তিন এখনো সেই রাজনৈতিক ও প্রতীকী উপাদানগুলোর অন্যতম, যা এই আঞ্চলিক কাঠামোকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
অতএব, আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ্যে কেবল আপাতদৃষ্টিতে একটি বিরোধ রয়েছে। ইরানের কৌশলগত চিন্তায় অধিকতর সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য হলো আগ্রাসনের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।
কূটনীতি এই কৌশল থেকে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু দৃশ্যত এটিকে আর যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে না। অতএব, ইরান হয়তো কোনো ‘তৃতীয় প্রজাতন্ত্রে’ প্রবেশ করছে না; বরং এটি তার বিপ্লবের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে—যার সূচনা হচ্ছে যুদ্ধ, প্রতিপক্ষদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত এবং প্রতিরোধনীতির গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।
সম্ভবত আগের কোনো পর্যায়ই এমন একটি কৌশলগত পরিবেশে শুরু হয়নি, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিরোধ, অভিযোজন এবং শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাকে এত স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। প্রতিপক্ষদের সর্বোচ্চ চাপের মধ্যেই ইরানি বিপ্লবের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে—পশ্চাদপসরণের প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে টিকে থাকা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে।
সাইয়্যেদ মার্কোস তেনোরিও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিবিষয়ক একজন ইতিহাসবিদ, লেখক ও বিশ্লেষক। তিনি ব্রাজিল-ইরান ফ্রেন্ডশিপ ইনস্টিটিউটের সভাপতি।
মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।