
গত সপ্তাহের শেষে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরাম’ ছিল এক অন্য রকম কূটনৈতিক মিলনমেলা। এই আড়ম্বরপূর্ণ সম্মেলনে সরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মূল আলোচ্য বিষয় না হলেও অনুষ্ঠানের পরতে পরতে অবধারিতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ওয়াশিংটন প্রসঙ্গটিই ঘুরেফিরে এসেছে।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে হাজার হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো—যখন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদেশগুলোকে তোয়াক্কা না করে কিংবা তাদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে বিশ্বব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তখন বিশ্ব কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বৈদেশিক নীতি এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সারা বিশ্বে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তুরস্কের মতো দেশ এবং অন্যান্য উদীয়মান বা মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলো নতুন পথ খুঁজছে। তারা এখন ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেশীদের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। গত রোববার শেষ হওয়া আন্তালিয়া ফোরামের আলোচনায় এ বার্তাই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্মেলনের সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে এ পরিবর্তন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। হাকান ফিদান বলেন, যদি এই অঞ্চল শুধু কোনো একজন ত্রাণকর্তা বা পরিত্রাতার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তবে সমস্যার সমাধান কোনো দিনও হবে না এবং শেষহীন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হবে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রগুলোকে এখন নিজ অঞ্চলের সমস্যার মালিকানা নিজেদের হাতেই তুলে নিতে হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের করুণা না খুঁজে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই নিজেদের ভূখণ্ডে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার নৈতিক ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকট নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বরাবরের মতোই তাঁর সেই বিখ্যাত কথা ‘পৃথিবী পাঁচের চেয়ে বড়’–এর পুনরাবৃত্তি করেন। মূলত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশের একক আধিপত্যের সমালোচনা করতেই রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এটি বলে থাকেন।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ফিরে আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত বৈদেশিক নীতিতে বড় ধরনের বদল এসেছে। তিনি জাতিসংঘকে অবজ্ঞা করেছেন, ন্যাটো সামরিক জোট থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং বিদেশের মাটিতে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের প্রচারের বিষয়ে চূড়ান্ত উদাসীনতা প্রকাশ করেছেন।
এমনকি অনেক মিত্রদেশের জোরালো বাধা সত্ত্বেও তিনি ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য তো নষ্ট করেছেই, বরং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাষ্ট্রগুলোকেও ইরানি প্রতিরোধের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
লন্ডনের আরবিসি ব্লুবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অর্থনীতিবিদ টিমোথি অ্যাশ এ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সম্মেলনে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সরাসরি তাদের মিত্রদের স্বার্থবিরোধী। এটি বিশ্বের সামনে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করেছে যে মার্কিনদের আর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পক্ষ মনে করার সুযোগ নেই এবং এখন তাদের একটি শক্তিশালী বিকল্প খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পাঁচ বছর ধরে চলে আসা আন্তালিয়া সম্মেলনটি মূলত তুরস্কের বিশ্ব দেখার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বরাজনীতিতে তাদের অবস্থানের প্রদর্শনী হিসেবে কাজ করে। এ আয়োজনে পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে থেকে আসা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ভিড় এটাই প্রমাণ করে যে বিশ্ব এখন আর এককেন্দ্রিক নয়।
ইউক্রেনের শীর্ষ কূটনীতিক এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিরা যেভাবে একই চত্বরে আলাদাভাবে বক্তব্য দিয়েছেন এবং একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক বার্তা দিয়েছেন, তাতে তুরস্কের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতাই ফুটে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও সেখানে কফির লাইনে বা মধ্যাহ্নভোজে ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ালেও সরাসরি কোনো বৈঠকে বসেননি। তবে একই চত্বরে তাঁদের উপস্থিতি শান্তির একটি ক্ষীণ ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দিয়েছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার নৈতিক ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকট নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বরাবরের মতোই তাঁর সেই বিখ্যাত কথা ‘পৃথিবী পাঁচের চেয়ে বড়’–এর পুনরাবৃত্তি করেন। মূলত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশের একক আধিপত্যের সমালোচনা করতেই রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এটি বলে থাকেন।
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর পদক্ষেপকে তিনি ‘গণহত্যা’ ও অনৈতিক আগ্রাসন বলে নিন্দা জানান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এরদোয়ান ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিজের ভূমিকার কথা বললেও রাশিয়াকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকেন।
ঠিক একইভাবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও ট্রাম্পের নাম সরাসরি মুখে আনেননি। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়, তবু নীতিগত দিক থেকে এই যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
এ সংকটে অনেক দেশই তাদের হতাশা গোপন করেনি। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি একটি আলোচনায় স্পষ্টই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যে যুদ্ধটি ঠেকানোর জন্য তাঁরা দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, আজ সেই যুদ্ধেরই বলি হতে হচ্ছে তাদের। কোনো কারণ ছাড়াই ইরান জর্ডানের ওপর যে আক্রমণ চালাচ্ছে, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনারই ফসল।
তবে আমেরিকান প্রতিনিধি হিসেবে সম্মেলনে আসা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অ্যাম্বাসেডর টম ব্যারাকের বক্তব্য ফোরামে উপস্থিত অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষ্য ছিল সরাসরি আধিপত্যবাদী। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর এই অঞ্চলের মানুষ শুধু একটি জিনিসকেই সমীহ করে আর সেটি হলো শক্তি। আপনি যদি শক্তি না দেখিয়ে দুর্বলতা প্রকাশ করেন, তবে আপনাকে পিছু হটতে হবে।
তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের লেবাস পরে আসা দেশগুলো শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হয়েছে। আরব বসন্তের পর যেসব গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা টিকতে না পারার নজির তুলে ধরে তিনি তথাকথিত ‘পরাক্রমশালী বা দয়ালু রাজতন্ত্রকে’ এই অঞ্চলের জন্য বেশি উপযোগী বলে পরোক্ষ সমর্থন দেন।
সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার যে নতুন আবহ এই ফোরামে তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল একটি নেপথ্য বৈঠক। তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যকার ওই আলোচনায় নতুন কোনো মেরুকরণের সুর পাওয়া যাচ্ছে। এই চার প্রভাবশালী দেশ তাদের সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর জোর দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই দেশগুলো মিলে শূন্যতা পূরণ করা সহজ কাজ হবে না। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক গালিপ দালে বলেন, এ অঞ্চলের বড় সংকট হলো যুক্তরাষ্ট্র অনেকের কাছে এখনো এক অর্থে অপরিহার্য পক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা হয়ে পড়েছে অবিভাজ্যভাবে অনির্ভরযোগ্য, বলপ্রয়োগকারী এবং খেয়ালি। এমন এক অদ্ভুত শক্তির মোকাবিলা করা সহজ নয় যে একদিকে অপরিহার্য আবার অন্যদিকে অপ্রত্যাশিতভাবে হুমকিদায়ক।
বোঝা যাচ্ছে যে তুরস্কের মতো দেশগুলো ওয়াশিংটনের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের যুগ পার করে একটি সার্বভৌম ও অঞ্চলকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে চায়। যদি সত্যি সত্যি বড় শক্তিগুলোর ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়, তবেই মধ্যপ্রাচ্য ও এর প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ হতে পারে। আন্তালিয়া ফোরাম সেই স্বপ্ন পূরণের কতটুকু কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বেন হাবার্ড দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ইস্তাম্বুল ব্যুরোপ্রধান
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত