
‘মন্তব্যের যুগে’ একটি অলিখিত কিন্তু অটল নিয়ম আছে: কোনো সেলিব্রিটিকে নিয়ে লিখলেই কেউ না কেউ অবজ্ঞাভরে লিখবে—‘কে?’। মজার ব্যাপার হলো, খেলাধুলা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের নিচে এমন ‘কে?’ মন্তব্য খুব একটা দেখা যায় না। যেন তারা বুঝে গেছে, ওসমান দেম্বেলেকে না চেনার কথা জাহির করা কোনো মর্যাদার বিষয় নয়; বরং এতে উল্টো বিব্রত হওয়ারই আশঙ্কা বেশি।
আমি অপেক্ষা করছি টেইলর সুইফটকে নিয়ে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদনের নিচে প্রথম ‘কে?’ মন্তব্যটি দেখার জন্য। কারণ, হয়তো শুনেছেন আজ (৪ জুলাই) নিউইয়র্কে তিনি এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসেকে বিয়ে করছেন। অবশ্যই তাঁরা বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহের ছুটির দিনটিকে। আর সেটিও কোনো সাধারণ স্বাধীনতা দিবস নয়; বরং থমাস জেফারসন রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ২৫০তম বার্ষিকী। (জানি, এখন কেউ বলবেন, ‘কে?’)
তবে সত্যি বলতে, টেইলর সুইফট সম্ভবত সেই একমাত্র নারী তারকা, যাঁকে না চেনার ভান করাও এখন আর সহজ নয়। তাঁকে বলা যায় এমন এক মানুষ, যাঁর সম্পর্কে না শোনা প্রায় অসম্ভব। তাঁকে না চেনা মানে যেন জি-৭-এর কোনো একটি দেশের নামই না শোনা।
কয়েক বছর আগে তাঁর নজিরবিহীন ও রেকর্ডভাঙা ‘ইরাস ট্যুর’-এর সময় টেইলর শুধু একজন পপ তারকা ছিলেন না; তাঁকে যেন চলমান এক বাণিজ্যিক নগর-রাষ্ট্র হিসেবে দেখা শুরু হয়েছিল। তাই তাঁর ও ট্রাভিসের বিয়ের আয়োজকেরা ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে একটি দুর্গ তৈরি করেছেন—এমন খবর শুনে সেটি একেবারেই অস্বাভাবিক মনে হয় না। আমি অবশ্য এটিকে ডিজনির রূপকথার দুর্গ হিসেবে নয়, বরং এমন এক মধ্যযুগীয় অজেয় দুর্গ হিসেবে কল্পনা করতে চাই, যেটি কেউ জয় করতে পারবে না। অবশ্য অনুষ্ঠান শেষে দুর্গটি ভেঙে ফেলা হবে। তবু কল্পনায় এটি যেন মঁ-সাঁ-মিশেল—যে দুর্গ শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধেও কখনো পরাজিত হয়নি। এই দুর্গ সব আক্রমণ সামলাতে প্রস্তুত।
গত মাসে যখন খবর বের হলো যে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনই তাঁদের বিয়ের ভেন্যু হতে পারে, তখন বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। একটু যেন নিজের অফিসেই বিয়ে করার মতো শোনাচ্ছিল। কিন্তু টেইলর সুইফট যে জগৎ তৈরি করেছেন, তার নিয়মে এটিই আবার সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়। এমন এক কনের জন্য এটি একেবারেই মানানসই, যিনি হয়তো নিমন্ত্রণপত্রের ক্যালিগ্রাফি বা সাদা রঙের বিভিন্ন শেড নিয়ে কিছুটা ভাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চিন্তা থাকে—অনুষ্ঠানের চারপাশে একটি ‘নো-ফ্লাই জোন’ নিশ্চিত করা।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই টেইলর সুইফট নিজের প্রেম, বিচ্ছেদ ও সম্পর্কের গল্পে নিজেকেই নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আর শেক্সপিয়ারের নাটক থেকে শুরু করে আধুনিক রোমান্টিক কমেডি—সবখানেই যেমন শেষ পর্যন্ত বিয়েই পরিণতি, এখানেও তা–ই ঘটছে। তবে আমি নিশ্চিত, এই সপ্তাহের ছুটিকে তিনি ‘সুখের সমাপ্তি’ বলতে নিরুৎসাহিত করবেন। বরং একে বলা যেতে পারে—তাঁর জীবনের ‘নতুন শুরুর যুগ’।
বিয়েকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই যতটা জল্পনাকল্পনা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তৈরি হয়েছে, তা প্রায় কেনেডি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হওয়া জল্পনার সমান। কোনো শিল্পী তাঁর ভক্তদের গোয়েন্দায় পরিণত করার কাজ টেইলর সুইফটের মতো এত দক্ষতার সঙ্গে করেননি। তিনি একটি ন্যাপকিন ফেলুন বা একটি গানের লাইন লিখুন—লাখো মানুষ তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সংকেত খুঁজতে শুরু করে। যেন সবাই প্রশ্ন করছে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন?’
তাই তাঁর বিয়ের আয়োজনও যেন সেই রহস্য-সংস্কৃতির চূড়ান্ত প্রকাশ। অবশ্যই সেখানে থাকবে ভুয়া সূত্র, ধাঁধা, ‘ইস্টার এগ’ ও ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি, যা ভক্তদের সমাধান করতে হবে। আর বরাবরের মতোই তথ্য গোপন ও ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেওয়ার এই কৌশল বিয়েটিকে এমন এক প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গেছে, যা হয়তো অনেক কম হতো যদি নবদম্পতি শুধু সংক্ষেপে অনুষ্ঠানসূচি জানিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অনুরোধ করতেন।
তবে হয়তো এটাই তাঁদের নতুন ধরনের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, যেখানে সবাই জানে কিছু একটা ঘটছে, কিন্তু ঠিক কী ঘটছে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। নিউইয়র্কে শুধু রাস্তা বন্ধ হওয়ার খবরই নিশ্চিত। হাজার হাজার মানুষ দিনরাত কাজ করছে, অথচ পুরো আয়োজন এখনো রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার পর্যায়ে। যেন ম্যানহাটান প্রজেক্ট, তবে বিয়ের জন্য।
এ লেখা যখন লিখছি, তখনো স্পষ্ট নয়—কী হয়েছে বা হয়নি। আগে কি ছোট পরিসরে গোপনে বিয়ে সেরে ফেলা হয়েছে? আজকের অনুষ্ঠান কি শুধু উদ্যাপন? বিশাল ভেন্যু হওয়ায় কি কিছু সৌভাগ্যবান ভক্ত ঢোকার সুযোগ পাবেন? আর সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—টেইলরের একসময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্লেক লাইভলি কি তাঁর বরসহ হাজির হবেন, নাকি অনুষ্ঠানে থাকবেনই না? সব মিলিয়ে তথ্য নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে এটি অসাধারণ এক সাফল্য। কারণ, এতে বহু প্রথম সারির তারকা অংশ নিচ্ছেন, একাধিক অনুষ্ঠান রয়েছে, আর সবকিছু ঘটছে ম্যানহাটানের প্রাণকেন্দ্রে।
তুলনা করে বলতে গেলে, এই তারকাবিয়ের নিরাপত্তা গত বছর ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিকল্পনার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত। সেই অভিযানের আগে তো ভুল করে একজন সাংবাদিককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার উচ্চপর্যায়ের গ্রুপ চ্যাটেই যোগ করে দেওয়া হয়েছিল। কী অপেশাদারত্ব! টেইলর সুইফটের ক্ষেত্রে এমন ভুল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
শেষ পর্যন্ত ভক্তরা হয়তো অনুষ্ঠানের ভেতরে থাকতে পারবেন না। কিন্তু টেইলর এমন কিছু করবেন, যাতে তাঁদেরও মনে হয় এই বিয়ের অংশ তাঁরাই। তাঁর অসাধারণ সাফল্যের রহস্যই হলো, তিনি একেবারে অনন্য একজন মানুষ, অথচ তাঁর বিশাল ভক্তগোষ্ঠীর কাছে তিনিই সবচেয়ে সহজে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় এমন ব্যক্তি।
একজন ধারাবাহিক গল্পকার হিসেবে টেইলর সুইফটের ক্যারিয়ারের গল্পও অসাধারণ।
আধুনিক যুগে এমন দীর্ঘ ও সফল বর্ণনামূলক যাত্রা খুব কমই দেখা গেছে। হয়তো মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স (যার জৌলুশ এখন অনেকটাই ম্লান) বা ‘মাগা’ আন্দোলন ছাড়া। তাঁর বিয়ে ভক্তদের সেই পরিণতি এনে দিচ্ছে, যার জন্য তাঁরা এত দিন অপেক্ষা করেছেন। অবশ্য ভক্তদের সবচেয়ে উগ্র অংশ মনে করেন, এমন সমাপ্তি পাওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। যাহোক, টেইলর তো মানুষকে খুশি রাখতেই ভালোবাসেন।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই টেইলর সুইফট নিজের প্রেম, বিচ্ছেদ ও সম্পর্কের গল্পে নিজেকেই নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আর শেক্সপিয়ারের নাটক থেকে শুরু করে আধুনিক রোমান্টিক কমেডি—সবখানেই যেমন শেষ পর্যন্ত বিয়েই পরিণতি, এখানেও তা–ই ঘটছে। তবে আমি নিশ্চিত, এই সপ্তাহের ছুটিকে তিনি ‘সুখের সমাপ্তি’ বলতে নিরুৎসাহিত করবেন। বরং একে বলা যেতে পারে—তাঁর জীবনের ‘নতুন শুরুর যুগ’।
মারিনা হাইড গার্ডিয়ানের কলামিস্ট
গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুদিত এবং কিছুটা সংক্ষেপিত।