
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অন্য দেশগুলো শুরু থেকেই তেলের দাম সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশেও তেলের দাম সমন্বয় করাটা অবধারিত ছিল। সরকার সিদ্ধান্তটি নিয়েছে কিছুটা দেরিতে। তবে বিশ্ববাজারে দাম যখন নিম্নমুখী, সে সময় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এসেছে।
বাংলাদেশ খুব বেশি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। কৌশলগত পণ্য হিসেবে তেলের দাম সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যানবাহন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানায় ব্যয় এমনকি ঘরে তৈরি করা পণ্যের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এতে সামগ্রিকভাবে জিনিসপত্রের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
অতীতের সরকারগুলো তেলের দাম আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দিত, সামগ্রিক কোনো পরিকল্পনা দেখা যেত না। দাম বাড়ানোর ফলে কোন কোন জায়গায় তার অভিঘাতটা এসে পড়তে পারে এবং এর প্রভাবগুলো কমানোর পথ কী, সেগুলো নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ দেখা যেত না।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস, এলপিজির খরচ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হলো এ খাতের বিদ্যমান অদক্ষতা। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের ওপর বড় আকারের কর ও ভ্যাট আরোপ করা আছে। কর-ভ্যাট কমিয়েও জ্বালানির দাম সমন্বয়ের একটা সুযোগ ছিল। সে ক্ষেত্রে একলাফে এতটা মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না। মূল্যবৃদ্ধির আগে এসব বিষয়ে সরকারকে আলোচনা করতে দেখা যায়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন খাতে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর কী কী অভিঘাত পড়বে, তার একটা মূল্যায়ন কি সরকার করেছে? আমরা এটা আন্দাজ করতে পারি যে তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের ওপর যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ আসবে আবার যানবাহন ও অন্যান্য সেবার দাম বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে যে জনগোষ্ঠী নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে তাদের জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী, সরকার কী করতে যাচ্ছে, সেটা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। মূল্যবৃদ্ধি করাটা হয়তো খুব সোজা একটি পদ্ধতি, কিন্তু কঠিন কাজটা হলো অভিঘাতগুলো নিয়ে যাচাই-বাছাই করা এবং সেই অনুযায়ী একটা পরিকল্পনার অধীনে সেটা বাস্তবায়ন করা।
আমাদের মনে রাখা দরকার, ২০২২ সালে জ্বালানির বড় একটা মূল্যবৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতিকে এমনভাবে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটা কিন্তু এখন পর্যন্ত কমানো যায়নি। এর কারণ হলো সেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের সঙ্গে অভিঘাত মোকাবিলায় সম্পূরক কোনো নীতি ছিল না। তেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার সম্পূরক নীতি কী হবে, সেটা সরকারের স্পষ্ট করে তুলে ধরা প্রয়োজন।
এ সময়ে কৃষি উৎপাদন যাতে স্বাভাবিক রাখা যায়, সে জন্য বাজেটে সরকারের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কেননা বৈশ্বিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে, যুদ্ধের কারণে বিশ্বে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সার, সেচসহ কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ করে বাস্তব সমাধান করতে হবে। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
দুই.
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, ধারাবাহিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে বড় ধরনের স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে আমরা একটা বড় ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছি।
এই সংকটকাল মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মধ্যে সংস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের কর খাত ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। কর খাতে সংস্কারের যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও নানাভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ব্যাংকিং খাত ও কর খাতে সংস্কারের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দুই মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। এ সময়ে সরকার খুব স্পষ্ট করে ব্যাংকিং খাত ও কর খাতে তার সুস্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারেনি। বরং কিছু পদক্ষেপ উন্নয়ন সহযোগীদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধন করে পুরোনো মালিকদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে যে প্রক্রিয়ায় বিদায় করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন আছে। কর খাতে সংস্কারের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।
ব্যাংক খাত, কর খাতে সংস্কারের এই বিষয়গুলো কিন্তু আইএমএফের চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়। দেশের নাগরিক সমাজ, থিঙ্কট্যাংক, অর্থনীতিবিদেরা কয়েক দশক ধরেই এই সংস্কারের কথা বলে আসছিলেন। বিশেষ করে গত এক দশকে সংস্কারের আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। এ বাস্তবতায় বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে সরকারের উচিত ছিল সংস্কারের জায়গাগুলোকে আরও জোরদার করা। সরকার আইএমএফের কাছে নতুন করে ঋণ চেয়েছে। একটা বিষয় হলো, বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে আইএমএফের সঙ্গে যদি নতুন ঋণ কর্মসূচি করতে চায়, তাহলে শর্তগুলো আরও কঠিন হবে।
একটা বিষয় হলো, বাংলাদেশের সংস্কারের ব্যাপারে আইএমএফ যদি কোনো নেতিবাচক প্রতিবেদন দেয়, তাহলে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের জন্যও বাংলাদেশের উন্নয়নে অর্থায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা আইএমএফের প্রতিবেদনের ওপর বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং অনেক দ্বিপক্ষীয় দাতা সংস্থাও নির্ভর করে।
বাংলাদেশ অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আরও বিস্তৃত ও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। সরকার যে সংস্কারের বিষয়ে আন্তরিক—এটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। সংস্কারের রূপরেখাটি কী হবে, তা নিয়ে অবশ্যই আইএমএফের সঙ্গে দেনদরবার হতে পারে। কিন্তু সংস্কারের বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সেটা ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততাকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিন.
বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সেটাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়াতে হয়েছে, আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ঈদের কারণে এবং যুদ্ধের শুরুতেই অনেকে তাদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোয় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেটটি হওয়া উচিত সংকটকালীন অর্থনীতির বাজেট। এ ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বা বড় অঙ্কের, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে, এমন বড় বাজেট প্রণয়ন করা বাস্তবসম্মত হবে না। একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীন সরকারকে দেখতে হবে কীভাবে রপ্তানি হ্রাসের চাপ মোকাবিলা করা যায়, কীভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সামাল দেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সরকারের হাতে থাকা নীতিগত হাতিয়ারগুলো (যেমন শুল্ক, শুল্কবহির্ভূত কর) যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা প্রয়োজন।
সরকারের রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও থাকতে হবে। যাঁরা প্রবাসে আছেন, অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী, তাঁদের জন্য কী ধরনের প্রণোদনা বা সুবিধা দেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাঁরা সরকারের সহযোগিতার বাইরে, তাঁদের সংকটকালীন সময়ে কীভাবে সহযোগিতা দেওয়া যায়, সেটা বের করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে হবে। আবার কিছু প্রকল্প হয়তো সরকারের নির্বাচনী অগ্রাধিকারের অংশ হতে পারে, কিন্তু সংকটকালীন বাজেটে সেগুলোর পুনর্বিন্যাস ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময়ে কৃষি উৎপাদন যাতে স্বাভাবিক রাখা যায়, সে জন্য বাজেটে সরকারের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কেননা বৈশ্বিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে, যুদ্ধের কারণে বিশ্বে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সার, সেচসহ কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ করে বাস্তব সমাধান করতে হবে। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম
selim.raihan@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব