
গত কয়েক দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো এই যুদ্ধ কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অসম্মানজনক এবং উন্মত্ততার সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের আঘাতে ইরানের একটি নৌজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা যেন দেখিয়ে দিল, বেপরোয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গোটা পৃথিবীই যুদ্ধক্ষেত্র।
কূটনীতি, যা ওয়াশিংটন নিজেই বিশ্বাসঘাতকতার মতো নস্যাৎ করেছে, তার জায়গা নিয়েছে অবিরাম বিমান হামলা। সেই হামলায় মারা যাচ্ছেন শত শত সাধারণ ইরানি নাগরিক, আহত হচ্ছেন আরও অনেকে। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস দিন দিন যেন এক উন্মাদখানায় পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধের লক্ষ্য প্রতিদিন বদলাচ্ছে। এদিকে তাঁর তথাকথিত ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ পিট হেগসেথ উন্মত্তের মতো চিৎকার করছেন—কোনো রকম দয়া ছাড়াই হত্যা করতে হবে।
এটাও এখন স্পষ্ট যে ইরানের বেঁচে থাকা অবশিষ্ট নেতারা ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের পুনরাবৃত্তির মতো করে মাথা নত করবেন না। ইরানের সামরিক শক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল হলেও তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ তুলে তারা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল—তাদের ওপর আবার হামলা হলে পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে।
এখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গেও যেন যুদ্ধে নেমেছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের সময়কার সেই কুখ্যাত নীতি ‘হয় তুমি আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে’—আবার সামনে এনেছেন তিনি।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, আর যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানন, শুধু চাইছে না এই সংঘাত থামুক। ব্রিটেন ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কিন্তু তবু তাদের ধীরে ধীরে এর ভেতরে টেনে নেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রাম্পের এই বিশ্বযুদ্ধে কোনো নায়ক নেই—আছে কেবল শিকার। ব্যতিক্রম বলতে স্পেনের দৃঢ়চেতা নেতা পেদ্রো সানচেজ।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। এখন ইরানে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য তাঁকে এবং ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের একটি স্কুলে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা, যা নিঃসন্দেহে জঘন্য অপরাধ। যুক্তরাজ্যসহ যেসব সরকার এখনো জাতিসংঘ সনদ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের উচিত এই দুই নেতার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এমনকি তাঁদের দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অনেক আমেরিকান ও ইসরায়েলি নাগরিক তাঁদের নেতাদের এই উন্মত্ত আচরণে ক্ষুব্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই দুই নেতা তাঁদেরই নামে এই সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন কংগ্রেস ও ইসরায়েলের নেসেট ব্যর্থ হয়েছে। তাই সচেতন নাগরিকদেরই এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধের দাবি তুলতে হবে। অনেক দিন ধরেই পরিষ্কার—ট্রাম্প ব্রিটেনের বন্ধু নন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই প্রাণঘাতী উদ্ধত আচরণ (যার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যকে আগাম কিছুই জানানো হয়নি) প্রমাণ করে তিনি এবং তাঁর প্রশাসন এখন ব্রিটেনের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য এটাই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যুদ্ধের প্রথম পাঠ: শত্রুকে চেনো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নাও। এটি ট্রাম্পের পছন্দের যুদ্ধ। কিন্তু ব্রিটেনেরও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে। আমেরিকার উপনিবেশগুলো যেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, তার আড়াই শতাব্দী পরে এবার হয়তো ব্রিটেনেরই আমেরিকার কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় এসেছে।
তথ্যগুলোই দেখুন। রাশিয়া যেমন ঠুনকো অজুহাতে ইউক্রেনে হামলা করেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে। ‘আসন্ন হুমকি’র যে যুক্তি তারা দিয়েছে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
মার্কিন বাহিনীর ওপর বিশ্বের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যুদ্ধের নিয়মকানুন মানারও বাধ্যবাধকতা নেই। নৈতিকতা বা আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না; এমনকি প্রকাশ্যেই একটি রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই উন্মত্ত অভিযান লাখো মানুষকে আতঙ্কিত ও বাস্তুচ্যুত করছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভ্রমণ ও জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যে ইসরায়েলের মতোই একটি আইন ভঙ্গকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং এটি যুক্তরাজ্যের জন্যও মৌলিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বোঝার জন্য আর কত প্রমাণ লাগবে?
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের তালিকা দীর্ঘ। তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছেন। বিশ্বস্ত ন্যাটো মিত্রের সার্বভৌম অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন। ইরানের কল্পিত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে চিৎকার করতে করতে নিজে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিকীকরণ করেছেন। জলবায়ু ইস্যুতে জাতিসংঘের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। বিশ্বজুড়ে কঠোর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছেন। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-কে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বেদনাদায়ক, ইউক্রেনকে বিশ্বাসঘাতকতার মতো ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার প্রতি আপসের নীতি নিয়েছেন। এসব পদক্ষেপই ব্রিটিশ জনগণ এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
অনেকে বলেন, ব্রিটেন প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে ইরান প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু এটি পরাজয়ের মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ই ব্রিটেন মার্কিন সহায়তা ছাড়া চলেছে। ভবিষ্যতেও চলতে পারবে—যদিও শুরুতে কিছুটা কষ্ট হতে পারে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন কর্মসূচি বাতিল করা হলে সেটি ইতিবাচক পদক্ষেপই হবে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য এটাই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যুদ্ধের প্রথম পাঠ: শত্রুকে চেনো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নাও। এটি ট্রাম্পের পছন্দের যুদ্ধ। কিন্তু ব্রিটেনেরও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে। আমেরিকার উপনিবেশগুলো যেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, তার আড়াই শতাব্দী পরে এবার হয়তো ব্রিটেনেরই আমেরিকার কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় এসেছে।
সাইমন টিসডাল দ্য গার্ডিয়ান–এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ