বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিরক্ষানীতি ২০১৮ ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা–ভাবনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ১৯৭৪ সালের পর এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তানীতিপত্র।
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ, আলোচনা ও সুপারিশের ধারাবাহিকতায় এটি প্রণীত হয়েছিল। ২০০৯ সালেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংসদীয় প্রতিরক্ষা স্থায়ী কমিটির কাছে এমন একটি নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছিল। নীতিতে ‘জনবান্ধব’ সশস্ত্র বাহিনীর ধারণা, ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু প্রশংসা আর আত্মতুষ্টি এক নয়। সাত বছর আগে যে বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে এই নীতি তৈরি হয়েছিল, সেই বাস্তবতা এখন অনেকটা বদলে গেছে। আজকের নিরাপত্তা পরিবেশ অনেক বেশি জটিল, দ্রুত পরিবর্তনশীল ও তথ্যনির্ভর।
অথচ বাংলাদেশ যখন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অনেকাংশে জন–আলোচনার বাইরে।
বাংলাদেশের ২০১৮ সালের প্রতিরক্ষানীতি এমন এক সময়ের জন্য লেখা হয়েছিল, যখন প্রচলিত প্রতিরোধ, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য আঞ্চলিক উত্তেজনাই ছিল প্রধান বিবেচনা। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন হাইব্রিড যুদ্ধ, অ্যালগরিদম-নির্ভর ভুয়া তথ্য, ড্রোন হামলা, প্রক্সি সংঘাত এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে নিরাপত্তার ধারণাই বদলে গেছে।
২.
কয়েক বছর ধরে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য কঠিন বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ; গাজা, লেবানন ও অন্যত্র ইসরায়েলি আগ্রাসন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কিউবা দখলের সাম্প্রতিক তোড়জোড়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান বিবাদ—এসব উদাহরণ থেকে সুস্পষ্ট, ভূখণ্ড দখলের রাজনীতি ইতিহাসের বিষয় হয়ে যায়নি। ২০২৩ সালে নাগোরনো-কারাবাখে আজারবাইজানের দ্রুত সামরিক অভিযানে এক লাখের বেশি আর্মেনীয় বাস্তুচ্যুত হন। কিন্তু সেটি শুধু সামরিক অভিযান ছিল না; একই সঙ্গে ছিল তথ্যযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাকু ইয়েরেভানের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। দক্ষিণ চীন সাগরেও চীনের ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট, প্রতিটি পদক্ষেপ আলাদা করে ছোট মনে হলেও সম্মিলিত ফল হতে পারে বড় ও প্রায় অপরিবর্তনীয়।
বাংলাদেশও কৌশলগত ঝুঁকির বাইরে নয়। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশের আকাশসীমা ও জলসীমায় মিয়ানমারের অনুপ্রবেশের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। এর বাইরে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে আছে, যেখানে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে অনেক বড় প্রতিবেশীর প্রভাবকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
২০১৮ সালের প্রতিরক্ষানীতিতে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও সংঘাত এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নীতিগতভাবে এটি সঠিক। কিন্তু আজকের বিশ্বে শুধু কূটনীতি যথেষ্ট নয়, যদি তার সঙ্গে শক্তিশালী তথ্যকৌশল না থাকে। কারণ, বয়ানের জায়গা ফাঁকা থাকলে অন্য কেউ সেটি পূরণ করে। আর তথ্যযুদ্ধের যুগে বয়ান হারানো মানে অনেক সময় কূটনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়া।
৩.
আজকের সংঘাত শুধু স্থল, জল বা আকাশে ঘটে না। একই সঙ্গে তা ঘটে তথ্যের ময়দানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুদ্ধক্ষেত্র ও জনপরিসরের ব্যবধান প্রায় মুছে দিয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোনো সামরিক ইউনিটের অবস্থান প্রকাশ করে দিতে পারে, সেনাসদস্যদের পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে, সংসদে বিতর্ক তৈরি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জনমত বদলে দিতে পারে। অনেক সময় এসব ঘটে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশের আগেই।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি শুধু সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখেনি; তথ্যযুদ্ধেও দক্ষতা দেখিয়েছে। তাদের ছিল কৌশলগত যোগাযোগ পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত তথ্য পেশাজীবী এবং এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা যে বয়ান নিয়ন্ত্রণ জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ।
বাংলাদেশের ২০১৮ সালের প্রতিরক্ষানীতিতে গণমাধ্যম সম্পর্ক নিয়ে মাত্র কয়েকটি সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ রয়েছে। সেখানে সুন্দর মিডিয়া-মিলিটারি সম্পর্ক বজায় রাখা এবং গণমাধ্যমকর্মী ও সামরিক সদস্যদের মধ্যে প্রশিক্ষণ বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটি পূর্ণাঙ্গ নীতি নয়; বরং একটি সদিচ্ছার ঘোষণা। এটি এমন সময়ের ভাষা, যখন গণমাধ্যম সম্পর্ককে মূলত জনসংযোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তথ্যকে রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সেনাসদস্যদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গোয়েন্দা ঝুঁকির উৎস হতে পারে। আর একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের সুনাম আজ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদের একটি।
৪.
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান। এখানে দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কাজ করেন। কিন্তু প্রশ্নটি ব্যক্তির নয়, কাঠামোর। ‘বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস জার্নাল’ ২০২৪ সালেই স্বীকার করেছে, গণমাধ্যম ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবে আইএসপিআরের কার্যক্রম সীমিত থাকে। স্বাধীন বিশ্লেষকেরাও প্রায় এক দশক ধরে একই ধরনের কথা বলে আসছেন।
বাস্তবতা হলো, আইএসপিআর এমন এক গণমাধ্যম পরিবেশের জন্য তৈরি হয়েছিল, যা এখন আর নেই। আজ দরকার তাৎক্ষণিক ভুয়া তথ্য প্রতিরোধের সক্ষমতা, সংকটের সময় পরীক্ষিত যোগাযোগ প্রটোকল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করার জন্য বেসামরিক মিডিয়া দক্ষতা। এসব ছাড়া আধুনিক তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলা করা কঠিন।
২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি এই ঘাটতি প্রকটভাবে সামনে এনেছিল। ওই ঘটনার পরপর প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল প্রতিক্রিয়াশীল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে জল্পনা–কল্পনাই জনপরিসরে প্রাধান্য পায়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও অনুরূপ প্রবণতা দেখা যায়। অনেকের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিগুলো দৃঢ় ও কার্যকর মনে হয়নি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বৈশ্বিক সুনামের বড় অংশ শান্তি রক্ষায় অবদানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি কনটিনজেন্ট নিয়ে অভিযোগ উঠলে অনেক সময় আগাম সুনাম রক্ষার কৌশল দেখা যায় না।
৫.
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শাসনব্যবস্থার ঘাটতি শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রে নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যের গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টেগ্রিটি (জিডিআই) সূচকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ডিওই ব্যান্ডে অবস্থান করেছে। এর অর্থ হলো প্রতিরক্ষা কার্যক্রম, ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উচ্চ দুর্নীতিঝুঁকি এবং স্বচ্ছতার গুরুতর ঘাটতি আছে। এটি কেবল বাইরের কোনো সংস্থার মন্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা এবং দেশের ভেতরে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বৈধতার ওপর।
বাংলাদেশ জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনপরামর্শের একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন ছিল। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা বাজেটও জনগণের বিষয়। জনগণের করের টাকা দিয়ে এই ব্যয় নির্বাহ করা হয়। জনগণের সন্তানেরাই সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে। তাই প্রতিরক্ষা ব্যয় কেন করা হচ্ছে, কীভাবে করা হচ্ছে এবং তার ফল কী—এসব জানার অধিকার জনগণের আছে।
৬.
সামগ্রিক বিবেচনায় এ মুহূর্তে চারটি সংস্কার জরুরি।
প্রথমত, সংশোধিত প্রতিরক্ষানীতিতে তথ্যযুদ্ধকে জাতীয় প্রতিরক্ষার একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশ অভিযানের মতো তথ্যক্ষেত্রের জন্যও পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, আইএসপিআরকে শুধু জনসংযোগ দপ্তর হিসেবে রাখলে চলবে না। এটিকে কৌশলগত যোগাযোগ কমান্ডে রূপান্তর করতে হবে। সেখানে সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসামরিক গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল যোগাযোগ পেশাজীবী এবং ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে দক্ষ জনবল থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, কর্মরত সামরিক সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রটোকল থাকতে হবে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে এ বিষয়ে নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি বিলম্বিত করার সুযোগ নেই।
চতুর্থত, জিডিআইয়ের পর্যবেক্ষণকে সুনামের জন্য অস্বস্তিকর বিষয় হিসেবে নয়; বরং শাসন সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিরক্ষা ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বাজেটের সংসদীয় তদারকি এবং স্বাধীন নিরীক্ষাব্যবস্থা ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষানীতি গড়ে ওঠে না।
বাংলাদেশের ২০১৮ সালের প্রতিরক্ষানীতি এমন এক সময়ের জন্য লেখা হয়েছিল, যখন প্রচলিত প্রতিরোধ, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য আঞ্চলিক উত্তেজনাই ছিল প্রধান বিবেচনা। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন হাইব্রিড যুদ্ধ, অ্যালগরিদম-নির্ভর ভুয়া তথ্য, ড্রোন হামলা, প্রক্সি সংঘাত এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে নিরাপত্তার ধারণাই বদলে গেছে।
রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ার মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব