
প্রায় ছয় বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে শ্বেতাঙ্গ এক পুলিশ কর্মকর্তার হাঁটুর চাপে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনা দেশটির রাজনীতিতে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। ওই ঘটনার পর কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন নতুন গতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়, যার অধিকাংশই ছিল শান্তিপূর্ণ। সেই সময়ই ‘পুলিশের বাজেট কাটো’ স্লোগানটি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
সে সময়টিকে উদারবাদী রাজনীতির এক উচ্চ মুহূর্ত বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে বাস্তবতা ভিন্নভাবে ধরা দেয়। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মূল্য ডেমোক্র্যাটদেরই দিতে হয়েছে। অনেক ভোটারের কাছে দলটি এমন এক অভিজাত গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিভাত হয়, যারা অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল, অথচ শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী আমেরিকানদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে অনাগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে মিনিয়াপোলিসেই সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট ও বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্টদের অভিযানে সাধারণ মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৭ জানুয়ারি তিন সন্তানের মা রেনি গুড ফেডারেল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে সরে যাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন। গুলি গাড়ির জানালা ভেদ করে তাঁর শরীরে লাগে। কয়েক সপ্তাহ পর, ২৪ জানুয়ারি, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের নার্স অ্যালেক্স প্রেটিকে মাটিতে ফেলে কাবু করার পর পেছন থেকে ১০ বার গুলি করা হয়। তখন তাঁর হাতে ছিল শুধু একটি মোবাইল ফোন।
এই দুই ঘটনায় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াও ছিল উদ্বেগজনক। কোনো প্রমাণ ছাড়াই স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তামন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম রেনি গুডকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও অভিবাসনবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেটিকে ‘সম্ভাব্য ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
মিনিয়াপোলিসে এ ধরনের গুলি চালানোর ঘটনা আসলে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। নামমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অথচ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে বাড়ির দরজা ভাঙা, মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া, এমনকি শিশুদের আটক করার অভিযোগ আগেও উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো পরোয়ানা বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। এসব তৎপরতা নিছক আইন প্রয়োগ নয়, বরং একধরনের প্রদর্শনমূলক নিষ্ঠুরতা।
পরিসংখ্যান বলছে, ওবামা প্রশাসনের সময়ে বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল তিন কোটির বেশি, বাইডেনের সময়ে প্রায় চার কোটি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এ সংখ্যা ছিল উনিশ লাখ। দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত বহিষ্কৃত হয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ। তবে ডেমোক্র্যাট প্রশাসনগুলো সাধারণত দণ্ডিত অপরাধীদের লক্ষ্য করেছিল এবং আটকের পদ্ধতিও তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল। শিশুদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা, শীতের মধ্যে বৃদ্ধদের ঘর থেকে টেনে বের করা বা এমন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া, যার ভাষা তারা জানে না—এ ধরনের অভিযোগ তখন তেমন শোনা যায়নি। রাস্তায় মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটেনি।
বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। এই সহিংসতা আকস্মিক নয়, বরং পরিকল্পিত। উদ্দেশ্য একটাই—দেশবাসীকে দেখানো যে ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত মাদক ব্যবসায়ী, অপরাধী ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেবে না। নাইন–ইলেভেনের পর জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন যেমন কর্মকর্তাদের ‘হাতের গ্লাভস খুলে ফেলতে’ বলেছিল, যার পরিণতিতে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড বৈধতা পায়। সেখানেও লক্ষ্য ছিল জনগণের কাছে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন।
প্রেটি ছিলেন বৈধ অস্ত্রের মালিক। গুলি করার আগেই তাঁর কোমর থেকে অস্ত্র খুলে নেওয়া হয়েছিল। অথচ এই তথ্যকেই প্রশাসন তাঁর হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা ট্রাম্পপন্থী অস্ত্রাধিকার কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ইতিহাস বলে, স্বৈরাচারী সরকারগুলো প্রায়ই এ ধরনের প্রদর্শনমূলক নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়। নাৎসি জার্মানিতে (স্টুরমআবটাইলুং) তথা নাৎসি পার্টির আধা সামরিক বাহিনী ইহুদি, কমিউনিস্ট ও অন্য অবাঞ্ছিতদের ওপর আক্রমণের লাইসেন্স পেয়েছিল। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্তালিনের আমলে নিপীড়ন ছিল নির্বিচার, যার ফলে সমাজজুড়ে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়। যদিও অধিকাংশ স্বৈরতন্ত্র নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেই লক্ষ্য করে।
আইসিই এজেন্টদের অভিযান যখন মূলত হিস্পানিক বা বর্ণবাদীভাবে চিহ্নিত মানুষদের লক্ষ্য করছিল, তখন অনেক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে তেমন শঙ্কিত ছিলেন না। কিন্তু রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ড সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে। তাঁরা দুজনই ছিলেন মার্কিন নাগরিক, মধ্য পশ্চিমের মূলধারার শ্বেতাঙ্গ সমাজের প্রতিনিধি। তকারও কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।
প্রেটি ছিলেন বৈধ অস্ত্রের মালিক। গুলি করার আগেই তাঁর কোমর থেকে অস্ত্র খুলে নেওয়া হয়েছিল। অথচ এই তথ্যকেই প্রশাসন তাঁর হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা ট্রাম্পপন্থী অস্ত্রাধিকার কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু ভুক্তভোগীদের পরিবার নয়, রাজনৈতিক বিভাজনের দুই পাশের বহু মানুষকেই নাড়া দিয়েছে। যদি প্রকাশ্যে এমনভাবে শান্তিপূর্ণ মার্কিন নাগরিককে হত্যা করা যায়, তবে নিরাপদ কে। প্রশাসন দ্রুতই বুঝতে পারে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি তাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তখন ভাষা কিছুটা নরম করা হয়। স্টিফেন মিলার প্রোটোকল লঙ্ঘনের আশঙ্কা স্বীকার করেন। ট্রাম্প নিজেও গুডের হত্যাকে একটি ট্র্যাজেডি বলে উল্লেখ করেন।
এতে সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে। কিন্তু কাছ থেকে গুলি করে দুই শান্তিপূর্ণ নাগরিককে হত্যার দৃশ্য সহজে মুছে যাওয়ার নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভও সহজে প্রশমিত হবে না। প্রশ্ন একটাই—এই ক্ষোভ কি নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তি হয়ে উঠবে।
ইয়ান বুরুমা মার্কিন বিশ্লেষক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ