
মানবসভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তনের পথে এমন কিছু বস্তু আছে, যাহা কেবল খাদ্যরূপে সীমাবদ্ধ থাকে নাই; বরং সময়ের প্রবাহে দর্শন, রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হইয়াছে। ডিম সেই সকল বস্তুসমূহের মধ্যে অন্যতম। আদিম যুগে, যখন মানবজাতি কৃষির আশীর্বাদ লাভ করে নাই, যখন শিকার ও সংগ্রহই ছিল জীবিকার প্রধান উপায়, তখন ডিম ছিল এক অমূল্য সম্পদ। পাখির বাসা হইতে সংগৃহীত একখানি ডিম মানেই ছিল খাদ্যনিশ্চয়তা।
পরবর্তীকালে কৃষিবিপ্লব মানবসভ্যতাকে যে বিপুল পরিবর্তনের দিকে ঠেলিয়া দেয়, তাহার সঙ্গে সঙ্গে ডিমের সামাজিক অবস্থানেও ঘটে এক ঐতিহাসিক অবনমন। কৃষিবিপ্লবের পর মানুষ যখন হাঁস-মুরগির সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করিল, তখন ডিম রাজদরবারের অলংকার হইতে নামিয়া আসিল শহুরে ব্যাচেলরের সকালের নাশতার থালায়।
নিম্নবিত্তের ভাতের সঙ্গে একখানি ডিম হইল বিলাস, আবার বিলাসের মধ্যেই নিত্যতা। এই পর্যায়ে ডিম পরিণত হইল এক আশ্চর্য গণতান্ত্রিক খাদ্যে, যাহা নিম্নবিত্তের জন্য প্রোটিন, শহুরে ব্যাচেলরের জন্য জাতীয় খাবার, আর মধ্যবিত্তের জন্য ‘আজ কিছু রান্না করিতে মন বসিছে না’ সমস্যার সহজ সমাধান।
অবশ্য রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত গোয়েন্দা কার্যালয় ডিমের আরও কিছু ব্যতিক্রমী উপযোগিতা আবিষ্কার করিয়াছিল বলিয়া অবগত হওয়া যায়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যেসব নাদান ব্যক্তি গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে নিজ নিজ বংশের নাম উজ্জ্বল করিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়াছিলেন, তাহারাই পরবর্তীকালে ডিমের সহায়তায় অপরাধ দমনের এক অভিনব পথ আবিষ্কার করিয়াছিলেন।
তাহাদের বিশ্বাস ছিল, অপরাধীকে বিচারালয়ের কাঠগড়ায় তুলিবার পূর্বেই কিছু ‘চিকিৎসা’ প্রদান করিলে সমাজ অধিকতর দ্রুত অপরাধমুক্ত হইবে। এই উদ্দেশ্যে ডিমকে ব্যবহার করিয়া যে পদ্ধতি প্রবর্তিত হইল, তাহার নামকরণ করা হইয়াছিল ‘ডিম থেরাপি’।
কিন্তু ইতিহাস সরলরৈখিক নহে। ইতিহাস ঘোরে, পাক খায় এবং প্রায়ই উপহাস করিয়া পুরোনো অধ্যায় ফিরাইয়া আনে নতুন রূপে। মূল্যস্ফীতি নামে এক রহস্যময় ও সর্বগ্রাসী দৈত্য যখন বাজারে আবির্ভূত হইল, তখন ডিমের ভাগ্য আবারও পরিবর্তিত হইল। দাম বাড়িল, সরবরাহ সংকুচিত হইল এবং সাধারণ মানুষের চোখে ডিম পুনরায় হইয়া উঠিল আকাঙ্ক্ষিত ও দুর্লভ।
যে ডিম একদিন ডাল–ভাতের পাশে নির্বিকার শুয়ে থাকিত, সেই ডিমই কাচের আলমারিতে রাখা অলংকারের মর্যাদা পাইতে শুরু করিল। সেই ডিমই পরিণত হইল হিসাব–নিকাশ ও দীর্ঘশ্বাসের উৎসে। ক্রমেই সেই ডিম হইয়া উঠিল রাজনৈতিক অস্ত্র, নির্বাচনী আতঙ্ক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
এই সময়েই ডিম প্রবেশ করিল রাজনীতির মাঠে। নির্বাচন যত ঘনাইয়া আসিল, ততই ডিমের গুরুত্ব কেবল খাদ্যতালিকায় নহে, রাজনৈতিক অভিধানেও বাড়িতে লাগিল। অবশেষে এমন এক ঘটনা ঘটিল, যাহা ইতিহাসে ‘ডিম-কাণ্ড’ নামে লিপিবদ্ধ হইবার যোগ্য। কে জানে, ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসবিদ হয়তো এই ডিম-কাণ্ড এইভাবে বর্ণনা করিতে পারেন যে—
নির্বাচনী প্রচারণাকালে এক তরুণ প্রার্থীর ওপর ডিম নিক্ষেপের অভিযোগ উঠিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, ডিমটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তাহার অভিঘাতে ১৩ জন প্রচারসঙ্গী গুরুতরভাবে আহত হইয়াছেন।
কেহ ডিমের কুসুমে পিচ্ছিল হইয়া মাটিতে পতিত হইলেন, কেহ ডিমের খোসার আঘাতে বিপর্যস্ত হইলেন, আবার কেহ মানসিক আঘাতে স্তব্ধ হইয়া গেলেন। কারণ, এই মূল্যস্ফীতির বাজারে এত দামি খাদ্য এমন অবিবেচনাপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হইতে পারে, তাহা তাঁহাদের কল্পনাকেও অতিক্রম করিয়াছে।
এই ডিমকে সাধারণ ডিম বলিয়া মানিতে নারাজ অভিযোগকারী পক্ষ। তাহাদের মতে, ইহা প্রতিপক্ষ প্রার্থী জনৈক ‘গ্যাংস্টারের’ ছোড়া অস্ত্র। এই ডিমের মধ্যে নাকি লুক্কায়িত ছিল সহিংস রাজনীতির কৌশল, ক্ষমতার লালসা এবং গণতন্ত্রবিরোধী মানসিকতার প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। ডিমটি ভাঙিবার সঙ্গে সঙ্গে নাকি নির্বাচনী পরিবেশও ভাঙিয়া পড়িয়াছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ‘গ্যাংস্টার’, যিনি বহুদিন ধরিয়া নির্বাচন করিয়া আসিতেছেন—তিনি দৃঢ় কণ্ঠে অভিযোগ অস্বীকার করিলেন। তিনি বলিলেন, মারিলে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র মারিবো, ডিমের মতো মহামূল্যবান বস্তু কেন অপচয় করিবো? ওই তরুণের জন্মেরও আগে হইতে আমি নির্বাচন করি। বহু প্রজাতির প্রতিদ্বন্দ্বীকে অত্যন্ত সুলভ ও সস্তা উপায়ে ঠেঙ্কাইয়া দৌড়ের ওপর রাখিয়াছি। ওই তরুণ জনগণের সহানুভূতি আদায় এবং সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যেই এই অভিযোগ তুলিয়াছে।
তিনি আরও বলিলেন, ‘এই মূল্যস্ফীতির বাজারে কারও ওপর ডিম ছুড়িয়া মারিবার মতো বিলাসিতা করার সামর্থ্য আমার নাই। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তরুণ প্রার্থীর দলের প্রধান নেতা সংবাদ সম্মেলনে হাজির হইয়া সাধুভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহার করিয়া এক দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করিলেন।
তিনি বলিলেন, ‘আজ যাহা ঘটিয়াছে, তাহা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু তাহার চেয়েও লজ্জাজনক হইতেছে এই ঘটনার অস্বীকার। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে এই ডিম-হামলা সংঘটিত করিয়াছে। একদিকে মঞ্চে উঠিয়া নীতি ও আদর্শের কথা বলিবেন, অন্যদিকে বিরোধীদের উপর ডিম নিক্ষেপ করিয়া দমন করিবেন—ইহা আমরা কখনোই মেনে লইব না।’
এদিকে নাগরিক সমাজ পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া এক অভিনব প্রস্তাব উত্থাপন করিল। তাহাদের মতে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধের স্বার্থে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি ডিমের দোকান, পাইকারি আড়ত এবং হাঁস–মুরগির খামার নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিলগালা করা উচিত। কারণ, যেখানে ডিম আছে, সেখানে সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই প্রস্তাবের পর হইতেই ডিমের বাজারে শুরু হইল তীব্র অস্থিরতা। নিম্নবিত্ত মানুষের হাঁড়ি শূন্য হইতে লাগিল, শহুরে ব্যাচেলরদের প্রোটিনস্বপ্ন ভাঙিয়া পড়িল। ডিম আর কেবল খাদ্য নহে, ইহা হইয়া উঠিল নিরাপত্তাঝুঁকি, নির্বাচনী আতঙ্ক এবং রাষ্ট্রীয় উদ্বেগের বিষয়।
এইভাবে ইতিহাসের এক নির্মম ও উপহাসপূর্ণ পরিহাসে আমরা এক বিস্ময়কর দৃশ্যের সম্মুখীন হইতেছি যে বিবর্তনের আদিম কোনো পর্যায়ে ডিম যেরূপ মানবজীবনের জন্য অমূল্য ছিল, মূল্যস্ফীতির দুর্ভিক্ষ ও নির্বাচনী উত্তাপের যুগে ডিম পুনরায় সেই অমূল্য মর্যাদাই ধারণ করিয়াছে। তবে এই অমূল্যতার প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই যুগে ডিম ছিল জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক, ভবিষ্যৎ সন্তানের নীরব আশ্বাস এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুদ্র কিন্তু দৃঢ় বিজয়। আর এই যুগে ডিম হইয়াছে ক্ষমতার হিসাব, সহিংসতার ভাষা এবং রাজনৈতিক নাটকের প্রধান চরিত্র।
তখন ডিম ভাঙিলে জন্ম নিত প্রাণ অথবা মিটিত ক্ষুধা, আর এখন ডিম ভাঙিলে জন্ম নেয় সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা বিবৃতি এবং টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ। সেই ডিম মানুষকে বাঁচাইত, এই ডিম মানুষের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বাঁচাইবার অথবা ধ্বংস করিবার উপকরণে পরিণত হইয়াছে। তখন ডিম ছিল নীরব, বিনয়ী ও প্রয়োজনীয়। এখন ডিম উচ্চকণ্ঠ, দামি ও ভয়ংকর। তখন ডিম সংগ্রহ করিতে মানুষ গাছে উঠিত, এখন ডিম নিক্ষেপ করিলে উঠে আসে গোয়েন্দা সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচনী কমিশনের উদ্বেগ।
ইতিহাসের এই বিদ্রূপ এখানেই শেষ নহে। যে ডিম একদিন দরিদ্রের শেষ ভরসা ছিল, আজ সেই ডিম দরিদ্রের নাগালের বাহিরে। যে ডিম একদিন ব্যাচেলরের নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিল, আজ সেই ডিম ব্যাচেলরের কাছে বিলাসিতা ও অপরাধের মাঝামাঝি কোনো অস্পষ্ট অঞ্চলে অবস্থান করিতেছে। অথচ রাজনীতির মঞ্চে সেই ডিমই এখন ছোড়া হয় অবলীলায়, যেন ইহা কোনো প্রাচীন গণতান্ত্রিক অধিকার, যার ওপর বাজারদর বা নৈতিকতার কোনো বিধিনিষেধ নাই।
অতএব বলা যায়, সভ্যতা যত অগ্রসর হইয়াছে, ডিম ততই পুনরায় আদিম হইয়াছে। খাদ্য হইতে ইহা অস্ত্র হইয়াছে, পুষ্টি হইতে ইহা প্রতীক হইয়াছে, আর জীবনের সম্ভাবনা হইতে ইহা হইয়াছে রাজনৈতিক কাঁপুনির উৎস।
সেই ডিম জীবন রক্ষা করিত বলিয়াই অমূল্য ছিল। আর এই ডিম রাজনীতিকে কাঁপাইতেছে বলিয়াই অমূল্য। সভ্যতার এই উন্নত পর্যায়ে দাঁড়াইয়া মানুষ শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করিল যে, প্রযুক্তি, আদর্শ ও আইন নয়, ডিমই এখন ইতিহাসের অন্যতম কার্যকর চালিকাশক্তি।
সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
ই-মেইল : shoikotamin@yahoo.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব