
শিশুদের হাতে চিপসের প্যাকেট কিংবা বার্গার দেখা এখন খুবই স্বাভাবিক। শহরের বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা বেড়েছে। অনেক মা-বাবাও সন্তানদের খুশি করতে ফাস্ট ফুডের দোকানে নিয়ে যান।
জন্মদিন কিংবা অন্য কোনো আনন্দের উপলক্ষ উদ্যাপনে এসব রেস্তোরাঁ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গ্রামেও চিপস, বিস্কুট ও অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবারের বিস্তার ঘটছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কোনো কোনো শিশু সকালের নাশতার পরিবর্তেও এসব খাবার খাচ্ছে। এ কারণে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের স্বাস্থ্য।
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য। নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। চিনিযুক্ত খাবার দাঁতের ক্ষয়েরও কারণ হতে পারে।
এ ধরনের খাবার বেশি খাওয়ার ফলে শাকসবজি, ফল, ডালসহ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতিও তৈরি হতে পারে। শৈশবে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাস অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও বজায় থাকে। তাই বিষয়টি শুধু শিশুদের বর্তমান স্বাস্থ্য নয়, ভবিষ্যতের সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে ২০১৮–১৯ সালে ৯ হাজার ৭৭২ জন কিশোর-কিশোরীর তথ্য নিয়ে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা ২০২৩ সালে কিউরিয়াস (Cureus) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী আগের সাত দিনে অন্তত সাতবার ভাজাপোড়া, মিষ্টিজাতীয় খাবার কিংবা চিনিযুক্ত পানীয়ের কোনো না কোনোটি গ্রহণ করেছে। ছেলেদের মধ্যে এই হার ৫৯ দশমিক ৩ এবং মেয়েদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
মা-বাবা ও অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের শুধু অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে নিষেধ করলেই হবে না; পুষ্টিকর খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি করতে হবে। বাজার করা, খাবার নির্বাচন ও রান্নায় শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী কিশোরীদের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কিশোরদের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার ছিল। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর-কিশোরীর ওজনও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। অর্থাৎ বাংলাদেশে অপুষ্টির দুই ধরনের সমস্যাই বিদ্যমান।
২০২৫ সালে অ্যাপেটাইট সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বাংলাদেশের ২০টি শহুরে বিদ্যালয়ের ৯৭৫ জন শিক্ষার্থীর খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে বিরতির সময় প্রায়ই কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার কিনে খায়। খাবারের স্বাদ, দাম, সহজলভ্যতা এবং খাবারটি নিরাপদ কি না, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা—এসব বিষয় তাদের পছন্দকে প্রভাবিত করে।
শিশুরা কেন এসব খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে? শুধু স্বাদ নয়, বিজ্ঞাপনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কার্টুন চরিত্র, জনপ্রিয় তারকা, খেলনা, উপহার কিংবা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের আকৃষ্ট করা হয়। এখন টেলিভিশনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ভিডিওতেও এসব খাবারের প্রচারণা চলছে। বিজ্ঞাপন শুধু শিশুদের পছন্দকেই প্রভাবিত করে না, বরং মা-বাবার কাছে নির্দিষ্ট খাবার কেনার আবদার তৈরির মধ্য দিয়েও পরিবারের কেনাকাটার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে সুরক্ষায় বিশ্বের কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। চিলি ২০১৬ সালে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় অতিরিক্ত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ক্যালরিযুক্ত খাবারের মোড়কে কালো রঙের সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে এসব খাবারের বিজ্ঞাপন প্রচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব খাবার বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই আইন বাস্তবায়নের পর বিদ্যালয়ে শিশুদের চিনি, লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ কমেছে।
ইংল্যান্ডে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে টেলিভিশনে রাত ৯টার আগে এবং অনলাইনে নির্দিষ্ট ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপনের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের খাবারের জন্য পুষ্টিমানভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব মানদণ্ডে ফলমূল, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শুধু শিশুদের ক্ষতিকর খাবার খেতে নিষেধ করলেই চলবে না; তাদের চারপাশে স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশও তৈরি করতে হবে। অন্যান্য দেশ যখন শিশুদের সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ফাস্ট ফুডের অনিয়ন্ত্রিত প্রসার ঘটছে। এই অবস্থার অবসান প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের নির্দেশনা পলিসিস টু প্রটেক্ট চিলড্রেন ফ্রম দ্য হার্মফুল ইম্প্যাক্ট অব ফুড মার্কেটিং অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতিকর বিপণন থেকে সুরক্ষায় সরকারকে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার চিহ্নিত করতে সরকার নির্ধারিত পুষ্টিমানভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন।
টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ সব ধরনের গণমাধ্যমে শিশুদের লক্ষ্য করে এসব খাবারের বিজ্ঞাপন ও প্রচার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে কার্টুন চরিত্র, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, খেলাধুলা ও আকর্ষণীয় উপহার ব্যবহার করে শিশুদের প্রলুব্ধ করার কৌশল সীমিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিক্রি ও প্রচার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
খাবারের মোড়কে সহজবোধ্য পুষ্টিসংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া এবং বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে স্বাস্থ্যকর খাবার সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হবে।
মা-বাবা ও অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের শুধু অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে নিষেধ করলেই হবে না; পুষ্টিকর খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি করতে হবে। বাজার করা, খাবার নির্বাচন ও রান্নায় শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বাড়িতে ফল, মৌসুমি সবজি ও পুষ্টিকর নাশতা রাখা এবং পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। খাবার নিয়ে শিশুদের লজ্জা দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া কোনো সমাধান নয়; বরং খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তাদের বোঝাতে হবে। মা-বাবার নিজেদের খাদ্যাভ্যাসও শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা একটি মৌলিক অধিকার। তাই অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষায় মা-বাবা, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনদাতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যবসায়িক মুনাফার চেয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী