দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং গণতান্ত্রিক শাসনের কাঠামো নতুন করে প্রতিষ্ঠার জন্যই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ ও সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সোৎসাহে অংশগ্রহণে এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করা।
তবে এই আলোচনার ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় উপেক্ষিত থেকে গেছে—সংসদ কীভাবে কার্যকর হবে, যদি দায়িত্বশীল, প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থবহ বিরোধী দল না থাকে? গণতন্ত্র কেবল শাসক দলের ক্ষমতা কমানোর প্রক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও নৈতিকতার ভেতরে ধরে রাখার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বিরোধী দল কোনো গৌণ উপাদান নয়, বরং গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দায়িত্বশীল বিরোধী দল ছাড়া সংসদ তার সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়। সুতরাং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থে আপস-মীমাংসার সংস্কৃতি আবশ্যিক। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল বিরোধী দল গড়ে তুলতে সুস্পষ্ট, ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও আইনি কাঠামোও জরুরি। অন্যথায় এই শূন্যতার অনিবার্য পরিণতি ঘটে সংসদের বাইরে।
মূলত দুটি কারণে বাংলাদেশে বিরোধী দল সংসদের বাইরের পথ বেছে নেয়। প্রথমত, সংসদে তাদের জন্য অর্থবহ ভূমিকা রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত ও অনিশ্চিত। বিরোধী দলকে প্রায়ই নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় রাখা হয়। সরকারের ‘দয়া’ বা ‘সৌজন্যের’ ওপর বিরোধী দলকে নির্ভর করতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের আগে তাদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা কম হয়, সংসদীয় কমিটিতে তাদের ভূমিকা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামগুলোতে তাদের অবস্থান খুবই প্রান্তিক। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এই সংস্কৃতির জন্ম। এই ধারাবাহিকতা স্বাধীনতা-পরবর্তীকালেও সংসদকে প্রায় একটি অনুমোদনযন্ত্রে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর সংসদ কার্যত একদলীয় চরিত্র ধারণ করে। ২০১৪ সাল থেকে ভোটারবিহীন সংসদের অভিযাত্রা।
দ্বিতীয়ত, মৌলিক কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসহযোগের ঐতিহাসিক সংস্কৃতি বিদ্যমান। বিরোধী দল যখন জানে সংসদে তাদের বক্তব্য শোনা হবে না, তাদের সংশোধনী প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হবে না কিংবা সরকারি অন্যায়ের তদারক করার কোনো কার্যকর ক্ষমতা তাদের নেই, তখন তারা গণমাধ্যম ও রাস্তাকেই তাদের রাজনৈতিক মূল মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজপথ গণতন্ত্রের প্রধান অস্ত্র ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজপথ নিয়মিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হতে পারে না।
বিশ্বের স্থিতিশীল ও পরিণত গণতন্ত্রগুলো দেখিয়েছে যে দায়িত্বশীল বিরোধী দল সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে গড়ে ওঠে। দলগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত, সংরক্ষিত ও চর্চিত।
ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে বিরোধী দলকে শুধু সমালোচনার সুযোগই দেওয়া হয় না, বিরোধীরা ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র আদলে বিকল্প সরকার গঠন করে। ছায়া মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের নিয়মিত, পেশাদার সমালোচনা ও পর্যালোচনা করেন। সাপ্তাহিক ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর সময়’ সরকারকে সরাসরি মুখোমুখি করে। ‘বিরোধী দলের দিন’-এর মতো ব্যবস্থা বিরোধী দল কর্তৃক উত্থাপিত বিষয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির আয়োজনে বাধ্য করে।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ‘জন হিসাব–সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি’-এর সভাপতি প্রধান বিরোধী দল থেকে আসে। সরকারের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিরোধী দলকে জাতীয় স্বার্থে একটি সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালনে বাধ্য করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে উত্থাপনের আগে সেগুলো প্রায়ই সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এই প্রক্রিয়া এবং আইন প্রণয়নের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ বিরোধিতার সংস্কৃতিকে ধ্বংসাত্মক অবস্থান থেকে গঠনমূলক দিকে রূপান্তর ঘটায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থে আপস-মীমাংসার সংস্কৃতি আবশ্যিক। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল বিরোধী দল গড়ে তুলতে সুস্পষ্ট, ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও আইনি কাঠামোও জরুরি।
অন্যথায় এই শূন্যতার অনিবার্য পরিণতি ঘটে সংসদের বাইরে। বিরোধী রাজনীতি সংসদ ত্যাগ করে রাজপথে স্থানান্তরিত হয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তখন নীতিগত বিতর্কের জায়গা ছেড়ে সহিংসতা, অবরোধ ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নেয়। সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহন করতে হয়।
কেবল বিরোধী দলকে কিছু কমিটিতে সদস্যপদ দেওয়া যথেষ্ট নয়। জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু কমিটির নেতৃত্ব পর্যায়ক্রমে বা একটি সুনির্দিষ্ট বণ্টননীতি অনুযায়ী বিরোধী দলের কাছে ন্যস্ত করা সম্ভব। এই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বের যোগ আছে। বিরোধী দলকে সংসদীয় নিয়মকানুন ও শিষ্টাচার মেনে কমিটির কাজে পেশাদারত্ব বজায় রাখতে এবং জাতীয় স্বার্থ ও গোপনীয়তা রক্ষা করে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে হয়।
প্রতিটি সংসদীয় অধিবেশনে নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত সময় সরকারের নীতি, সিদ্ধান্তের ওপর বিরোধী দলের পূর্ণাঙ্গ, অনবরুদ্ধ সমালোচনা শোনার জন্য সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে। এই সময়ে সরকারি দলের কোনো বাধা বা সংখ্যা কম হওয়ার হুমকি থাকতে পারবে না। সমালোচনার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে যুক্তিগ্রাহ্য ও লিখিত জবাব দেওয়া এবং বিরোধী দলের যুক্তিসংগত প্রস্তাবগুলো সততার সঙ্গে বিবেচনা সরকারের দায়িত্ব হতে হবে।
জাতীয় গুরুত্বের বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে বাধ্যতামূলক, সময়োচিত ও গোপনীয়তা রক্ষাকারী পূর্ব আলোচনা চালু করা যেতে পারে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন, যুদ্ধ বা শান্তি–সংক্রান্ত বৈদেশিক নীতি, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণী বিষয়ে সরকারকে আইন দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে আস্থাভাজন আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিরোধী দল জাতীয় সিদ্ধান্তের দায়িত্বে ভাগ নিলেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কার আলোচনায় শুধু ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ বা ‘নির্বাচনী ব্যবস্থা’র কথা বললে তা অর্ধসত্য থেকে যায়। ‘দায়িত্বের ভারসাম্য’ ও ‘সংসদীয় সংস্কৃতির রূপান্তর’-এর কথাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বলা দরকার।
একটি কার্যকর, জীবন্ত সংসদ ও টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই উপলব্ধি প্রয়োজন যে তারা উভয়ই রাষ্ট্রের অংশ; তারা এক অর্থে সরকারেরও অংশ। তাদের উভয়েরই চূড়ান্ত জবাবদিহি সার্বভৌম জনগণের কাছে।
বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা কেবল রাস্তায় বিক্ষোভের মাত্রায় নয়, বরং সংসদে তারা কতটা গভীর যুক্তি দিতে পারে তার ওপর। জাতীয় সমস্যার জন্য তাদের প্রস্তাবিত বিকল্প নীতি কতটা বাস্তবসম্মত তার ওপর। জাতীয় সংকটকালে তাদের প্রদর্শিত দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই তা পরিমাপ করা যায়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র তখনই পরিণতির দিকে যাত্রা করবে, যখন বিরোধী দল সরকারের ‘প্রতিপক্ষ’ হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশীদার হওয়ার দায়িত্ব অনুভব করবে। দায়িত্বশীল বিরোধী দল সরকারকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হতে বাধ্য করতে পারে। দায়িত্বশীল সরকার বিরোধী দলকে গঠনমূলক বিকল্পের প্রস্তাবক হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করতে পারে।
কার্যকর সংসদ মানে শক্তিশালী সরকার ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের সহাবস্থান। একটিকে দুর্বল করে অন্যটিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা গণতন্ত্র নয়; তা নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদ জন্ম দেয়। এই পারস্পরিকতা তৈরির মাধ্যমে সংসদ যদি রাজনৈতিক বিতর্ক, জবাবদিহি ও বিকল্প চিন্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবেই ২০২৬-এর নির্বাচন প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের সূচনা করবে।
● ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ
* মতামত লেখকের নিজস্ব