পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রাম বাজরিয়ায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ধ্বংস করে দেওয়া একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর পতাকা হাতে এক কিশোর
পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রাম বাজরিয়ায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ধ্বংস করে দেওয়া একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর পতাকা হাতে এক কিশোর

মতামত

ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতি? কোন যুদ্ধবিরতি?

গাজায় যুদ্ধবিরতির কথা বলে পশ্চিমা দেশগুলো যখন নিজেদের কৃতিত্ব প্রচার করছে, ঠিক সেই সময় দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে—বিশ্বরাজনীতি আসলে কোন পথে যাচ্ছে?

দুই বছর ধরে দৃশ্য একই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখে সহিংসতার নিন্দা করে, কিন্তু কাজে ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনে না। এই প্রতিক্রিয়া দুর্বল, ফাঁপা এবং পুরোপুরি অনুমেয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরেই পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ২৬০টির বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব হামলায় মানুষ আহত ও নিহত হয়েছে, ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে, গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, কৃষিশ্রমিকদের মারধর করা হয়েছে, জলপাইগাছ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—সবই ফসল তোলার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে।

এই সহিংসতা আকস্মিক নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ১ হাজার ৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন; তাঁদের মধ্যে ২২৯ জন শিশু। একই সঙ্গে চলছে ব্যাপক উচ্ছেদ। ২০২৫ সালের শুরুতে উত্তর–পশ্চিম তীরে ‘আয়রন ওয়াল’ অভিযানে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষকে জোরপূর্বক ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়—১৯৬৭ সালের পর একসঙ্গে এত বড় উচ্ছেদের নজির নেই।

এ সময় আমি দখলকৃত পশ্চিম তীরে সফরের সুযোগ পাই। ব্রিটিশ এমপি অ্যান্ড্রু জর্জ ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব জাস্টিস ফর প্যালেস্টিনিয়ানসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে জেরুজালেম থেকে তুলকারেমে যাই। ৫০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে আমাদের লাগে তিন ঘণ্টার বেশি। চেকপোস্ট ও ঘুরপথে চলাচলই ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন বাস্তবতা।

তুলকারেমে আমরা দেখি ভাঙা রাস্তা, গুঁড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি। জানুয়ারি থেকে ‘আয়রন ওয়াল’ অভিযানে তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থীশিবিরের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। ছয় কক্ষের একটি বাড়িতে প্রায় ৫০ জন উচ্ছেদ হওয়া মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি অভিযানের চিহ্ন—দেয়ালে গুলির দাগ—এখনো স্পষ্ট। ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর আমাদের জানায়, তাকে একটি গর্তে ফেলে সামরিক কুকুর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সে এখন আর টিভি দেখতে পারে না—ভাঙা টেলিভিশনের দিকে ইশারা করেই কথাটি বলে।

স্পষ্ট করে বলতে হয়, ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে জীবনের মতো মৌলিক মানবাধিকারকেও কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। আমরা দেখছি জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অবৈধ বসতি নির্মাণ করা হচ্ছে ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে।

আমার সফরের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তবু আমাদের সরকার কার্যকর কোনো অবস্থান নেয়নি।

অনেকে বলেন, ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আলাদা। বাস্তবে তা নয়। আমি নিজে দেখেছি—মাসাফের ইয়াত্তা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীরা রাইফেল হাতে ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখাচ্ছে, আর সেনারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কোথাও কোথাও সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, একই সামরিক পোশাক ও অস্ত্রসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। এই দৃশ্যই দুইয়ের অখণ্ড সম্পর্ক স্পষ্ট করে।

গত মাসে জেনিনে ২৬ বছর বয়সী আল-মুনতাসির আবদুল্লাহ ও ৩৭ বছর বয়সী ইউসুফ আসাসাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার খবর সেই অভিজ্ঞতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হলেও যুক্তরাজ্য সরকার আবারও কেবল ‘উদ্বেগ’ জানিয়েছে।

এই সহিংসতা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েল ‘ই-১’ এলাকায় তিন হাজারের বেশি নতুন বসতি ইউনিট অনুমোদন দেয়, যা পশ্চিম তীরকে কার্যত দ্বিখণ্ডিত করবে। আন্তর্জাতিক মহল একে বহুদিন ধরেই ‘রেড লাইন’ বললেও যুক্তরাজ্য এখানেও কথার বাইরে যায়নি।

এখানেই মূল সমস্যা। বলা হয়, যুক্তরাজ্যের নাকি বড় ‘প্রভাব’ আছে। কিন্তু সেই প্রভাব কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন আমরা তা কখনো ব্যবহার করি না। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, তৈরি হয়েছে অজুহাতের নাটক। যদি ফিলিস্তিনিদের ওপর এই ভয়াবহ সহিংসতা ঠেকাতে আমরা আমাদের প্রভাব ব্যবহার না করি, তাহলে সেই প্রভাবের মানে কী?

স্পষ্ট করে বলতে হয়, ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে জীবনের মতো মৌলিক মানবাধিকারকেও কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। আমরা দেখছি জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অবৈধ বসতি নির্মাণ করা হচ্ছে ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন পরিষ্কার বলছে, সমষ্টিগত শাস্তি, দখলকৃত জমিতে বসতি স্থাপন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও বলেছেন, পুরো দখলদারিই অবৈধ। তাহলে আমাদের সরকারের সীমারেখা কোথায়?

যুক্তরাজ্য সরকার সম্ভবত চায় বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের কথা ভুলে যাক। গাজায় গণহত্যায় নিজেদের ভূমিকার কারণে তারা এই তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’কে দায় এড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে। কিন্তু শুধু ‘উদ্বেগ’ জানানোই যথেষ্ট নয়।

ইসরায়েলের কাছে যুক্তরাজ্যের সব ধরনের অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে হবে, অবৈধ দখলদারিকে সমর্থনকারী ইসরায়েলি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ জবাবদিহির প্রক্রিয়াগুলোকে সমর্থন করতে হবে এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ব্রিটিশ নাগরিকদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ন্যায়বিচার শুধু কথায় আসে না, এর জন্য প্রয়োজন বাস্তব ও শক্ত পদক্ষেপ। আর সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।

  • শকাত আদম স্বতন্ত্র এমপি, লেস্টার সাউথ, যুক্তরাজ্য

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত