
পৃথিবীব্যাপী চলমান লিঙ্গবৈষম্য মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতিসংঘের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, পদক্ষেপ: সকল নারী ও মেয়েদের জন্য’। এই বিষয়টি বেছে নেওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো আইনি অধিকার প্রাপ্তিতে লিঙ্গভিত্তিক অসমতা, ন্যায়বিচারের পথে বাধা ও বাস্তব পদক্ষেপের অভাব।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২০২৬) দেখা গেছে যে জরিপকৃত ৭০ শতাংশ দেশে ন্যায়বিচার লাভের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি বাধার সম্মুখীন হয়। প্রতিবেদনে আরও দেখানো হয় যে বৈষম্যমূলক আইনকাঠামো বিরাজ করার কারণে বিশ্বব্যাপী পুরুষদের আইনগত অধিকারের মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোগ করে নারী, ৫৪ শতাংশ দেশে ধর্ষণের নেই কোনো সম্মতিভিত্তিক আইন। দেশগুলোর মধ্যে ৭২ শতাংশ আবার সব বা কিছু ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে অনুমোদন দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ৪৫টির বেশি দেশ তাদের জাতীয়তা সম্পর্কিত আইনে কমপক্ষে একটি লিঙ্গবৈষম্যভিত্তিক বিধান এখনো বজায় রেখেছে।
এ ধরনের বৈষম্যমূলক আইনি ব্যবস্থা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নারীদের জীবনকে প্রভাবিত করে। ফলে সমতা বৃদ্ধির সুযোগ সমাজ থেকে হারিয়ে যায় অনেকাংশেই। তাই রাষ্ট্র ও সমাজ নারীকে কী চোখে দেখে, তা বিশ্লেষণ করলে সেই পরিসরে নারীর সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব।
মূলত বিশ্বের কোনো দেশই এখনো লিঙ্গভিত্তিক আইনি সমতা সম্পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারেনি। কর্মক্ষেত্র, সম্পত্তির অধিকার, নিরাপত্তা ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারীরা এখনো আইনের মাধ্যমে পিছিয়ে আছে। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান গতিতে চললে এই আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আরও প্রায় ২৮৬ বছর সময় লাগবে। তবে শুধু কাগজে-কলমে অধিকার থাকলেই হয় না, সেটির সঠিক বাস্তবায়নও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো দেশে সংবিধান থেকে শুরু করে বেশ কিছু লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ আইন থাকলেও নানা সামাজিক রাজনৈতিক কারণে বহু নারীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই জাতিসংঘের এবারের প্রতিপাদ্যে শুধু এক দিনের জন্য নারী দিবস উদ্যাপন না করে বা শুধু প্রতিশ্রুতির কথা না বলে, সরাসরি ‘অ্যাকশন’ বা পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন বিভিন্ন দেশের বৈষম্যমূলক আইনগুলো বাতিল করা ও সুরক্ষামূলক আইনগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত ও জনপরিসরে নারীর জীবনকে অনেকখানি সহজ করে তুলতে সাহায্য করবে।
নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—অধিকার, ন্যায়বিচার ও পদক্ষেপ—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব দিক দিয়েই ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। লিঙ্গবৈষম্যহীন সমাজ গঠনে একদিকে যেমন সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে নারী-পুরুষ সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে, ঠিক তেমনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জেন্ডার-সংবেদনশীল মনন নিয়ে আইন প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে শিক্ষা ও সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়ে নারী ও মেয়েশিশুদের ওপর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নানা পরিসরে ও মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ৭৮৬ জন নারী ও মেয়ে ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫৪৩ জনই শিশু। অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যাও তাই বেড়েছে অনেক গুণ। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। ধর্ষণ ও হত্যা ছাড়াও অনলাইনে বিদ্বেষ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে বহু নারী।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জরিপ অনুযায়ী, ৮.৩ শতাংশ নারী প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত নির্দিষ্ট কিছু জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা যৌন ব্ল্যাকমেল, ছবি নিয়ে অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদ্বেগের বিষয় হলো, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, ভুক্তভোগী নারীদের মধ্যে সেই সচেতনতাও কম। দুজনের মধ্যে একজনের কম নারী (৪৮.৫ শতাংশ) জানেন যে কোথায় সহিংসতার অভিযোগ জানাতে হয় এবং মাত্র ১২.৩ শতাংশ নারী সহিংসতার সহায়তাকারী হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে অবগত।
এর অর্থ হলো, সহিংসতা হ্রাসে আইন ও আদালত থাকলেও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার পথ থেকে নারীরা এখনো অনেক দূরে। আর এর পেছনে রয়েছে পিতৃতন্ত্রের নানাবিধ সামাজিক—রাজনৈতিক রূপ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের মননে তথা সামাজিক পরিসরে এতটাই শক্তিশালীভাবে প্রোথিত হয়ে যায় যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই সেগুলোকে সহজ বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই ধরে নিই।
এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক সিলভিয়া ওয়ালবি তাঁর থিয়োরাইজিং প্যাট্রিয়ার্কি (১৯৯০) বইতে দেখিয়েছেন, পিতৃতন্ত্র মূলত ছয়টি পরস্পর-সংযুক্ত কাঠামো যেমন অর্থনীতি, পরিবার, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ইত্যাদি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজে বজায় থাকে। ওয়ালবি যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের আইন, নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোও পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধে গঠিত। অর্থাৎ এগুলো দেখতে ‘সাধারণ’ বা ‘সবার জন্য’ মনে হলেও, বাস্তবে পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার বা নারীদের অধীন অবস্থায় রাখার প্রয়াসে চলমান থাকে। একে ওয়ালবি ‘দ্বৈত রাষ্ট্রীয় চরিত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
উদাহরণ দেওয়া যাক, অন্তর্বর্তী সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ সংশোধন করে ৭টি আইনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করে ১ জুলাই অধ্যাদেশ জারি করে। তাদের মধ্যে ‘যৌতুক নিরোধ আইন’ ২০১৮-এর ধারা-৩ (যৌতুক দাবি করার দণ্ড) ও ধারা-৪ (যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ ইত্যাদি)-এ বর্ণিত অভিযোগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার অর্থ, প্রথমে ভুক্তভোগী নারীকে লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করতে হবে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে যেকোনো পক্ষ প্রয়োজনে আদালতে মামলা করতে পারবে। এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে, একজন নারীকে যৌতুকের জন্য বাধ্য করার পর কীভাবে ‘মধ্যস্থতা’কে একটি ‘সমাধান’ ভেবে আইন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীকে সাধারণত অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক একটি পক্ষ হিসেবেই দেখে থাকি আমরা। তাই এ ধরনের আইনের ব্যবহার ভুক্তভোগীকে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীর সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করে থাকে।
এভাবে রাষ্ট্র একটি ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া ব্যক্তিগত অধিকার-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে নারীর রাজনৈতিক তথা জনপরিসরের উপস্থিতিকেও সংকুচিত করে ফেলে অবধারিতভাবেই। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভোটের লড়াইয়ে থাকা ৮৭ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে সাতজন বিজয়ী হয়েছেন, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে একমত হলেও সেই অঙ্গীকার কেউ পূরণ করতে পারেনি।
তবে রাজনীতির মাঠে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় দলগুলো অনেকাংশে ব্যর্থ হলেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল প্রতিশ্রুতির ছাপ। নারী বিষয়ে বিএনপির ইশতেহারের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদানের ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে ‘নারী চলবে নির্ভয়ে’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নারীদের জন্য পিক আওয়ারে আলাদা বাস সার্ভিস ও গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশটি কার্যকর মনে হয়েছে। এনসিপিও তাদের ইশতেহারে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য প্রতি মাসে এক দিন অর্ধবেতনে ঐচ্ছিক ‘পিরিয়ড লিভ’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা যেতে পারে।
সুতরাং নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—অধিকার, ন্যায়বিচার ও পদক্ষেপ—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব দিক দিয়েই ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। লিঙ্গবৈষম্যহীন সমাজ গঠনে একদিকে যেমন সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে নারী-পুরুষ সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে, ঠিক তেমনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জেন্ডার-সংবেদনশীল মনন নিয়ে আইন প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে শিক্ষা ও সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
এই নারী দিবসে তাই কেবল বেগুনি পোশাকের প্রতীকী উদ্যাপন নয়, বরং সবাইকে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে যেন বাংলাদেশের প্রতিটি নারী ও মেয়েশিশু নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমতার ছায়াতলে তাদের সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারে।
● উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব