‘আমেরিকা সবার আগে’—এই চিন্তাধারা মানুষ ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছে
‘আমেরিকা সবার আগে’—এই চিন্তাধারা মানুষ ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছে

মতামত

বিভাজনের রাজনীতি থেকে মানুষ মুখ ফেরাচ্ছে

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব নেওয়ার পরই তাঁকে সবচেয়ে গুরুতর সিদ্ধান্তগুলোর একটি নিতে হচ্ছে। পারমাণবিক হামলা হলে ব্রিটেন কী করবে, সেই নির্দেশনা তাঁকে সামরিক বাহিনীকে দিতে হবে। কারণ, এ সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা শুধু প্রধানমন্ত্রীর হাতে।

আজ ইউরোপের মানুষ ষাটের দশকের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছে। পরমাণুবিজ্ঞানীদের তৈরি পারমাণবিক ‘ডুমসডে ক্লক’ ক্রমেই মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, পোল্যান্ড ও জার্মানি নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি কিংবা নিজেদের দেশে অন্য দেশের পারমাণবিক অস্ত্র রাখার কথা ভাবছে।

পৃথিবী ধীরে ধীরে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে গায়ের জোরে চলা ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। সেখানে ন্যায় বা আইন নয়, শক্তিই শেষ কথা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ভানও ছেড়ে দিয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, তাইওয়ানের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ ‘কোনো শক্তি বা কোনো ব্যক্তি ঠেকাতে পারবে না’।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মুছে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ ওমানেও বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। এসব ঘটনা দেখায়, মানবাধিকার, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা ও আইনের শাসনের মতো পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধা নেই।

তবু আশার কারণ আছে। সংঘাতের ভয় বাড়লেও বিশ্বজুড়ে মানুষ বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করতে চায়। আমার নতুন বইয়ের জন্য রকফেলার ফাউন্ডেশনের পক্ষে ফোকালডেটা ৩৪টি দেশে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ করেছে। আমি রকফেলার ফাউন্ডেশনের একজন ট্রাস্টি।

আমরা মানুষকে প্রশ্ন করেছিলাম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তাঁরা তা সমর্থন করবেন কি না। ৫৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা করবেন। বিপক্ষে ছিলেন মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ ‘আমেরিকা সবার আগে’, ‘রাশিয়া সবার আগে’, ‘চীন সবার আগে’ বা ‘আমার দেশ সবার আগে’—এই চিন্তাধারা মানুষ ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছেন। এসব মতবাদ পৃথিবীকে ‘আমরা’ ও ‘তারা’র অন্তহীন লড়াই হিসেবে দেখে।

প্রতিটি মহাদেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই জাতীয়তাবাদী নেতাদের বিরোধিতা করছে, যারা নিজেদের দেশকে গুটিয়ে রাখতে চায়। তাদের ধারণা, এক দেশ ভালো করতে হলে অন্য দেশকে খারাপ অবস্থায় যেতে হবে। বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ চায় তাদের সরকার মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষা করুক, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করুক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে পদক্ষেপ নিক এবং মানবিক সহায়তায় অর্থ দিক।

পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষ এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা চায়, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করবে। দারিদ্র্য, রোগ, ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমর্থন কীভাবে বাড়ানো যায়, তা-ও এখন আমরা জানি। যারা নিজেদের সমাজে সক্রিয় এবং জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি। জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তারা সহযোগিতার পক্ষে থাকে। তাই সীমান্তের ওপারে সহযোগিতা বাড়াতে হলে আগে নিজের দেশের সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হবে। তবে প্রশ্ন হলো এখন মানুষকে এক করবে কে? পৃথিবী একমেরু ব্যবস্থা থেকে বহুমেরু ব্যবস্থায় যাচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ঠিক করত এবং নিজের ইচ্ছা কার্যকর করতে পারত। এখন চীনের উত্থানসহ একাধিক শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে।

জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের তিন প্রধান পারমাণবিক শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। বরং মানুষ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের মানুষকে এক করার সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখছে। এই দেশগুলোর মানুষও সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দিতে বেশি আগ্রহী।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিশালী দেশকে বড় বিষয়ে চাপ দেওয়া কঠিন। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়ে তাদের বিশাল ক্ষমতা রয়েছে। সামরিক হুমকি, শুল্ক, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তারা অন্য দেশকে চাপ দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আবার ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। তবু এখনই ভাবতে হবে, প্রযুক্তি যেখানে রাষ্ট্রের ওপর প্রভাবশালী, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এবং রাষ্ট্র যেখানে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন চীনে—এই দুই মডেলের বাইরে আমরা কীভাবে এগোব।

ইতিমধ্যে অন্য অনেক দেশ বাণিজ্য বিরোধ মেটানোর নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ ঠেকাতে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এশিয়াকেন্দ্রিক সিপিটিপিপি একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য জোট হতে পারে।

রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বাইরে থাকা দেশগুলোর হাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের ৭৫ শতাংশ ভোট রয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতেও তাদের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ ভোটের মধ্যে ১২টি এবং ৫টি ভেটোর মধ্যে ২টি তাদের হাতে। তাই জলবায়ু সংকট, মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করা এবং এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা অসম্ভব নয়।

নতুন বছরে নতুন জাতিসংঘ মহাসচিব দায়িত্ব নেওয়ার পর সহযোগিতায় বিশ্বাসী দেশগুলোর উচিত তাঁর সঙ্গে ২০২৭ সালের একটি কর্মসূচিতে একমত হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও অন্য দেশ থেকে নিজেদের আলাদা করে চলার পক্ষে নয়। তারা সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা চায় এবং চায়—যুক্তরাষ্ট্র জোরজবরদস্তি করে নয়, অন্য দেশকে বোঝানোর মাধ্যমে নেতৃত্ব দিক। বহুমেরু বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে চলা বন্ধ করতে হবে।

এখন অগ্রগতি নির্ভর করবে যুক্তরাজ্য ও সহযোগিতায় বিশ্বাসী অন্য দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগের ওপর। আমাদের জরিপের বার্তা স্পষ্ট। বিশ্বের মানুষ একটি ভালো পৃথিবীর আশায় তাকিয়ে আছে। আর সংকটে থাকা পৃথিবীও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এটি ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আমাদের সবার জন্যও।

  • গর্ডন ব্রাউন জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ দূত ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত