
এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছি। কিছু সত্য ব্যক্তিগত বলেই শুধু বলা কঠিন নয়; তাদের কাছে ফিরে গেলে বহু বছর আগের নিজেরই একটি ছোট্ট সংস্করণের মুখোমুখি বসতে হয়। আজও সেই শিশুটির কাছে ফিরে গেলে চোখে জল আসে। তবু লিখছি।
করুণা পাওয়ার জন্য নয়। লিখছি, কারণ পৃথিবীর অসংখ্য মেয়ে, ছেলে, নারী ও পুরুষের শরীরের ভেতর এমন না-বলা ইতিহাস আছে। শরীর, রক্ত, আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, নির্যাতন—সবকিছুর চারপাশে আমরা এত ‘চুপ’ বসিয়ে দিয়েছি যে যার সঙ্গে অন্যায়টি ঘটে, অনেক সময় সে-ই জানে না তার অভিজ্ঞতার ভাষা কী।
এই ব্যথার কথা আমি বাইরে থেকে শুনিনি। ঠিক কত বছর বয়স ছিল মনে নেই—ছয় কি সাত। শুধু জানি, এতটাই ছোট ছিলাম যে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সম্মতি—এসব শব্দ তখনও আমার পৃথিবীতে জন্মায়নি।
ঘটনাটি জাপানে। একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মানুষ, যাঁকে কোনো কারণে আমার পরিবার বিশ্বাস করেছিল। ঘরটি মনে নেই। দিনটি মনে নেই। কীভাবে তাঁর সঙ্গে একা হয়েছিলাম, তাও মনে নেই। কখনো মনে হয়, হয়তো কোনো চলন্ত বাসে ছিলাম; স্মৃতির ভেতর আজও চারপাশ দ্রুত ছুটে যাওয়ার একটি অনুভূতি আছে। সত্যিই কি কিছু চলছিল, নাকি আতঙ্কে আমার ছোট্ট পৃথিবীটাই দুলছিল—জানি না।
আর মনে আছে সালফারের মতো তীব্র, অচেনা একটি গন্ধ। স্মৃতি অদ্ভুত। সে পুরো ঘটনা রেখে দেয় না। সময় মুছে দেয়, স্থান মুছে দেয়, দৃশ্য হারিয়ে ফেলে—অথচ রেখে দেয় একটি গন্ধ, একটু গতি, কিছু অনুভূতি। কিন্তু ভয়টা মনে আছে। মনে আছে, তিনি আমার চুল শক্ত করে ধরে আমাকে এমন একটি যৌন কাজে বাধ্য করেছিলেন, যা আমি চাইনি, বুঝিনি—যা কোনো শিশুর জীবনে আসারই কথা নয়।
তারপর মনে আছে বমি। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। ছোট্ট শরীরজুড়ে এমন এক ব্যথা, যার অর্থ বোঝার বয়স আমার ছিল না। যে ঘটনার অর্থ বোঝার ভাষা আমার ছিল না, তার ব্যথা আমার শরীর ততক্ষণে শিখে ফেলেছিল। শিশুমন তখনও জানত না কী ঘটেছে; শরীর তার আগেই জেনে গিয়েছিল—কেউ তার সীমানা ভেঙে গেছে।
এর পরের অংশ ঝাপসা। হয়তো বাবা-মাকে বলেছিলাম শরীর ভালো লাগছে না। হয়তো তাঁদের সামনেও বমি করেছিলাম। জানি না। সেই ‘মনে নেই’-টুকুও আমার স্মৃতির সত্য। মনে আছে, আমাকে বলা হয়েছিল—বাবা-মাকে যেন না বলি। আমি সম্ভবত বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুটি ভয় পাশাপাশি জন্ম নিয়েছিল। বললে বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবেন—আমি তাঁদের কষ্ট দিতে চাইনি। আবার তাঁরা যদি সেই মানুষটিকে প্রশ্ন করেন? যদি তিনি জেনে যান আমি বলে দিয়েছি? যদি ফিরে এসে আরও আঘাত করেন?
শিশুর ভয় যুক্তির ব্যাকরণ জানে না। তাই চুপ করেছিলাম। যে শিশুটির ছুটে গিয়ে কারও কোলে আশ্রয় নেওয়ার কথা, সে উল্টো ভাবছিল কীভাবে নিজেকে এবং বাবা-মাকে রক্ষা করবে। কোনো শিশুর এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাওয়ার কথা নয়। আমি আমার বাবা-মাকে দোষ দিই না। তাঁরা আমাকে ভালোবাসতেন। তাঁদের প্রজন্মের অনেক বাবা-মায়ের মতো হয়তো তাঁরাও জানতেন না—শিশুকে তার শরীরের ভাষা শেখানোও ভালোবাসার একটি উপায়।
শুধু ‘কিছু হলে আমাকে বলবে’ যথেষ্ট নয়। একটি শিশুকে জানতে হবে—তোমার শরীর তোমার। কেউ তার সীমানা ভাঙলে দোষ তোমার নয়। আমি তোমাকে শুনব, বিশ্বাস করব, নিরাপদ রাখব। আমাকে রক্ষা করা তোমার কাজ নয়; তোমাকে রক্ষা করা আমার কাজ। আমরা নিষ্পাপতার সঙ্গে অজ্ঞতাকে গুলিয়ে ফেলেছি। অথচ শরীরের সহজ, সুন্দর, সত্য ভাষাটি না শেখানোই কখনো শিশুকে অন্যের বিকৃত ভাষার সামনে অসহায় করে দেয়।
শৈশবের সেই অসহায়তা আমার ভেতরে আরেকটি জিনিসেরও জন্ম দিয়েছিল, প্রতিরোধ। কৈশোরে একা চলতে গিয়ে একাধিকবার পুরুষের যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছি। এমন মুহূর্ত এসেছে যখন চিৎকার করেও সাহায্য পাইনি। আমাকে বাঁচতে হয়েছে নিজের গলার সমস্ত শব্দ দিয়ে, দাঁত দিয়ে, হাতের কাছে যা পেয়েছি তা দিয়ে।
শিখেছিলাম—কেউ যদি আমার ‘না’ শুনতে অস্বীকার করে, আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই ‘না’ তাকে শোনাতে হবে। শৈশবের ভীত শিশুটি কোথায় যেন এক বুনো কিশোরীতে পরিণত হলো। সে চিৎকার করতে জানত, লড়তে জানত, নিজেকে বাঁচাতে জানত। কখনো মনে হয়, আমার ভেতর তখন এক কালী জন্ম নিয়েছিলেন—ধ্বংসের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য। যে শক্তি বলে— এই শরীর আমার। এর অধিকার আমার। তুমি তা ছিনিয়ে নিতে পারো না।
কিন্তু প্রতিরোধের গল্প শুধু বিজয়ের নয়। সাহায্য চাইতে গিয়ে অনেক সময় দেখেছি, প্রশ্নের মুখ আমার দিকেই ঘুরে গেছে—আমি কেন একা ছিলাম, কোথায় গিয়েছিলাম, কী পরেছিলাম, আমার চলাফেরা কেমন ছিল। যেন অপরাধীর কাজের ব্যাখ্যাও কোনোভাবে আমার জীবনযাপনের মধ্যে খুঁজতে হবে। অপরাধীর দিকে যে প্রশ্ন যাওয়ার কথা, তা ফিরে এসেছে নির্যাতিত মানুষের দিকে। এই বিচারও এক ধরনের ক্ষত। নিজেকে বাঁচিয়ে ফিরে আসা একজন মানুষের প্রথম প্রয়োজন চরিত্রের পরীক্ষা নয়। তার প্রথম প্রয়োজন বিশ্বাস।
আজ কখনো ভাবি, শৈশবের সেই স্মৃতি আমার জীবনের কত অদৃশ্য নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। মানুষের পুরো জীবনকে একটি ঘটনার সমীকরণে নামিয়ে আনা যায় না। তবু নিজেকে প্রশ্ন করি—নিজেকে অবশ করে অতীত ভুলে থাকতে চাওয়া, নিজের শিকড়ে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, পশ্চিমা আধিপত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আমার দীর্ঘ প্রতিরোধ—এসবের কোনো কোনো সুতো কি সেই স্মৃতির কাছে গিয়ে পৌঁছায়?
জানি না। তবে জানি, শিশুর ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতা কখনো ‘ছোট্ট একটি ঘটনা’ নয়। কিছু ঘটনা কয়েক মিনিটে শেষ হয়; তাদের প্রতিধ্বনি একটি জীবন ধরে চলতে পারে। অনেক পরে আমি একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে বিয়ে করেছিলাম। তিনি সেই মানুষ ছিলেন না—আমার বুদ্ধি তা জানত। তবু অন্তরঙ্গতার কোনো কোনো মুহূর্তে শরীর যেন হঠাৎ বহু বছর আগের সেই শিশুটির কাছে ফিরে যেত। বমি আসত, শরীর প্রত্যাখ্যান করত। শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
কৈশোরে ঢাকা শহরের পথে পথে ঘুরতে ভালোবাসতাম। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল মুনিরের সঙ্গে—এক পথশিশু, অপূর্ব গান গাইত। একদিন সে বলেছিল, যে মানুষটি তাকে ধর্মীয় শিক্ষা দিত, সেই শিক্ষকই তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে এসেছিল। কিশোরী আমি তখন ধর্ম আর ধর্মের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বুঝিনি। শুধু প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল।
কাউকে দোষ দিতে এ কথা বলছি না। বলছি, কারণ শরীর কখনো কখনো মনের চেয়ে অন্যভাবে সময় গোনে। আজও লিখতে লিখতে চোখে জল আসে। ক্ষতটি রয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষত শুধু আমাকে ভাঙেনি। তার ভেতর দিয়েই আমি নিজের শক্তিকেও চিনেছি। যে অভিজ্ঞতা একদিন আমাকে অসহায় করেছিল, তারই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দাঁড়াতে একদিন শিখেছি—নিজের কণ্ঠ, নিজের শরীর, নিজের জীবনকে আর কারও হাতে সমর্পণ না করতে।
ব্যথা আমার জীবনের শেষ কথা হয়ে থাকেনি; সেই ব্যথার ভেতর থেকেই একদিন আমার প্রতিরোধের আলো জন্মেছে। আমি স্বাধীন হতে শিখেছি। প্রশ্ন করতে শিখেছি। নিজের শরীর, জীবন ও বিশ্বাসের ওপর অন্যের মালিকানা অস্বীকার করতে শিখেছি। হয়তো আমার বুনো হয়ে ওঠার মধ্যেও সেই শিশুটির অংশ আছে—যে একদিন চুপ করেছিল, তারপর ঠিক করেছিল আর সবসময় চুপ থাকবে না।
কৈশোরে ঢাকা শহরের পথে পথে ঘুরতে ভালোবাসতাম। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল মুনিরের সঙ্গে—এক পথশিশু, অপূর্ব গান গাইত। একদিন সে বলেছিল, যে মানুষটি তাকে ধর্মীয় শিক্ষা দিত, সেই শিক্ষকই তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে এসেছিল। কিশোরী আমি তখন ধর্ম আর ধর্মের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বুঝিনি। শুধু প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল।
যে মানুষের কণ্ঠে একটি শিশুর আল্লাহর বাণী শোনার কথা, তাঁর কাছেই যদি শিশুটির শরীর নিরাপদ না থাকে—তবে তাকে আমরা কোন ধর্ম শেখালাম? পরে বুঝেছি, এই অন্ধকারের কোনো একক ধর্ম নেই। মাদ্রাসা, গির্জা, আশ্রম, স্কুল, পরিবার—সবখানেই ঘটেছে। মেয়েদের সঙ্গে। ছেলেদের সঙ্গেও। এবং নির্যাতন শৈশবেই শেষ হয় না।
বিয়ে কোনো আজীবন সম্মতিপত্র নয়। নারী কিংবা পুরুষ—কারও শরীরই অন্য কারও সম্পত্তি নয়। বয়স, সম্পর্ক, বিবাহ কিংবা ভালোবাসা—কোনোটিই একজন মানুষের শরীরের ওপর অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। বয়স শরীরের মর্যাদা কেড়ে নেয় না। বিয়ে শরীরের মালিকানা বদলায় না। প্রেম কোনো অধিকারপত্র নয়। আর এখানেই আমার প্রশ্ন—আমরা শরীরকে এত ভয় পাই কেন?
যে শরীর নিয়ে জন্মাই, তার কথাই ফিসফিস করে বলি। যে রক্ত জীবনের সম্ভাবনা বহন করে, তাকে লুকাই। যে আকাঙ্ক্ষা দুটি মানুষকে ভালোবেসে কাছে আনতে পারে, তাকেও লজ্জা বানাই। নিজের সন্তানদের বড় করতে গিয়ে আমি তাই অন্য একটি ভাষা খুঁজেছি। আমার ছেলে আমার মেয়ের চেয়ে মাত্র এক বছরের বড়। যখন তার কণ্ঠ বদলাতে শুরু করল, শরীর বদলাল, যখন বুঝলাম তার শরীর সন্তান সৃষ্টির বীজ বহন করার সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে—আমি চাইনি জীবনের এই পরিবর্তনটি তার কাছে কোনো গোপন লজ্জা হয়ে থাকুক।
এক বছর পর আমার মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাব হলো। সে আগে থেকেই জানত এই দিনটির অর্থ কী। তাই ভয় পায়নি। লজ্জাও পায়নি। বরং বাথরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আনন্দে ডাকছিল— ‘মা! মা! মা! আমার পিরিয়ড হয়েছে!’ সেদিন পূর্ণিমা ছিল। আমি আমার মাকে খবর দিলাম, আশপাশের কাছের নারীদের ডাকলাম। আমরা চাঁদের নিচে বসেছিলাম। প্রত্যেকে আমার মেয়েকে নিজের প্রথম ঋতুস্রাবের গল্প বলেছিল—কেউ হাসতে হাসতে, কেউ স্মৃতির ভেতর ফিরে গিয়ে।
আমি তাকে বলেছিলাম—তুমি বড় হচ্ছ। তোমার শরীর নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। এই শক্তির সঙ্গে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে দায়িত্ব; নিজের শরীরের প্রতি, অন্যের শরীরের প্রতি, নিজের আকাঙ্ক্ষার প্রতি, অন্য মানুষের সম্মতির প্রতি। আমি আমার পুরুষ বন্ধুদের বলেছিলাম তাকে চিঠি লিখতে। যারা এই পথ আগে হেঁটেছে, তারা যেন একজন কিশোরকে পুরুষ হয়ে ওঠার অর্থ শুধু শরীর দিয়ে নয়—দায়িত্ব, কোমলতা ও সম্মান দিয়েও বুঝতে সাহায্য করে।
তার এক বছর পর আমার মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাব হলো। সে আগে থেকেই জানত এই দিনটির অর্থ কী। তাই ভয় পায়নি। লজ্জাও পায়নি। বরং বাথরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আনন্দে ডাকছিল— ‘মা! মা! মা! আমার পিরিয়ড হয়েছে!’ সেদিন পূর্ণিমা ছিল। আমি আমার মাকে খবর দিলাম, আশপাশের কাছের নারীদের ডাকলাম। আমরা চাঁদের নিচে বসেছিলাম। প্রত্যেকে আমার মেয়েকে নিজের প্রথম ঋতুস্রাবের গল্প বলেছিল—কেউ হাসতে হাসতে, কেউ স্মৃতির ভেতর ফিরে গিয়ে।
আমার নারী বন্ধুদেরও বলেছিলাম তাকে চিঠি লিখতে। যেন একজন মেয়ে নারী হয়ে ওঠার দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু নিষেধের তালিকা না পায়; আগের প্রজন্মের নারীদের কাছ থেকে পায় গল্প, সাহস, জ্ঞান, মমতা। তারপর সেই আনন্দকে আমরা আরও বড় করে তুললাম। আমার যে সাংস্কৃতিক পরিসরে ছবি, গান, কবিতা, নাটক আর নানা শিল্পচর্চা হতো, সেখানে আমরা আয়োজন করলাম—‘লাল’। ছিল আলোকচিত্র, চিত্রকলা, গান, কবিতা, নাটক, কর্মশালা, কথোপকথন। নারী-পুরুষ একসঙ্গে কথা বলেছিল ঋতুস্রাব, বয়ঃসন্ধি, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা, সম্মতি, জন্ম, শরীর, আনন্দ—এমনকি এসবের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য নিয়েও।
‘লাল’ শুধু ঋতুর রক্তের লাল ছিল না। রক্তের লাল। জন্মের লাল। ফুলের লাল। আগুনের লাল। পূর্ণিমার নিচে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার লাল। আমার দুই সন্তানের শরীর যখন শৈশব থেকে আরেক জীবনের দিকে এগোল, আমরা তাকে ‘চুপ’ দিয়ে ঢেকে দিইনি। আমরা তাকে উদযাপন করেছি। অথচ বাংলাদেশে এখনও ঋতুস্রাবকে বলি—‘শরীর খারাপ’। কিন্তু শরীর তো খারাপ হয়নি। আমি এখন নিজের ঋতুচক্রের প্রায় শেষ প্রান্তে। সেই রক্তের দিকে ফিরে তাকিয়ে লজ্জা নয়, শ্রদ্ধা অনুভব করি। এই চক্রই আমার শরীরকে জীবনের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত করেছে। আমার শরীরই একদিন আমার সন্তানদের প্রথম পৃথিবী ছিল।
শরীর ও প্রেম নিয়ে আমাদের আরও কথা বলা দরকার—আরও সত্য করে, আরও সুন্দর ভাষায়, আরও আলোয়। যাতে শিশুর প্রথম শিক্ষা ভয় না হয়, কিশোরের প্রথম শিক্ষক পর্নোগ্রাফি না হয়, মেয়ে নিজের রক্তকে ঘৃণা না করে, ছেলে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষমতা বলে ভুল না করে।
তোমার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যের শরীর তোমার নয়। আমরা এই সহজ ভাষাটি শেখাইনি। বরং বলেছি—চুপ। রক্তের কথা বলো না। শরীরের কথা বলো না। আকাঙ্ক্ষার কথা বলো না। প্রেমের শরীরের কথা বলো না। তারপর সেই নীরবতার শূন্যস্থান পূরণ করেছে কখনো বিকৃত গল্প, কখনো সহিংসতা, কখনো পর্নোগ্রাফি। পর্নোগ্রাফির গভীর বিপদ হয়তো নগ্নতা নয়। শরীরের ভেতর থেকে মানুষটিকে মুছে ফেলা। অথচ প্রেমের মিলন তার সম্পূর্ণ বিপরীত হতে পারে। পুরুষের আনন্দ অধিকার নয়। নারীর আনন্দ অনুগ্রহ নয়। শরীরের মাপ, শক্তি কিংবা স্থায়িত্ব ভালোবাসার মাপকাঠি নয়।
প্রশ্নটি আরও গভীর—তুমি কি প্রিয় মানুষটির শরীর শুনতে জানো? তার নিঃশ্বাস, সংকোচ, আনন্দ, নীরবতা, তার ‘না’, তার নিজের ইচ্ছায় বলা ‘হ্যাঁ’? কারণ শরীর শুধু দেখার নয়। শরীর শোনারও। শরীর নোংরা নয়। রক্ত নোংরা নয়। বীজ নোংরা নয়। আকাঙ্ক্ষা নোংরা নয়। আনন্দ নোংরা নয়। প্রেম তো নয়ই।
নোংরা হলো ক্ষমতার জোরে অন্যের শরীর দখল করা। শিশুকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো। ভালোবাসার নামে মালিকানা ফলানো। একটি সম্পূর্ণ মানুষকে শুধু একটি শরীরে নামিয়ে আনা। হয়তো আমরা এতকাল ভুল জায়গায় লজ্জা রেখেছি। সহিংসতাকে লজ্জা না দিয়ে শরীরকে দিয়েছি। অপরাধীকে প্রশ্ন না করে নির্যাতিত মানুষকে করেছি। সম্মতি না শিখিয়ে সংকোচ শিখিয়েছি। আর বলেছি—চুপ, এসব কথা বলতে নেই। আমি সেই ‘চুপ’-টুকুই ভাঙতে চাই।
সব ব্যক্তিগত কথা প্রকাশ্যে বলতে হবে বলে নয়। বরং কোনো মানুষ যেন ভয়ে তার প্রয়োজনীয় কথাটুকু বলতে না পারে—সেই নীরবতা ভাঙতে চাই। আমি চাই একটি শিশু নিজের শরীরকে ভয়ের আগে ভালোবাসতে শিখুক। একটি মেয়ে তার প্রথম রক্তকে লজ্জা না ভাবুক। একটি ছেলে তার বদলে যাওয়া শরীরকে বিস্ময়, দায়িত্ব ও সম্মানের সঙ্গে চিনুক।
আর একদিন তারা যখন কাউকে ভালোবাসবে, জানুক—ভালোবাসা মানে কাউকে পাওয়া নয়। তার স্বাধীনতা, ইতিহাস, শরীর, সীমা ও আনন্দসহ তাকে অনুভব করা। সহিংসতা শরীরের দরজা ভেঙে ঢোকে। প্রেম বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। সহিংসতা কেড়ে নেয়। প্রেম জানতে চায়। সহিংসতা বলে—তোমার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। প্রেম বলে—তুমি কী চাও, বলো।
হয়তো তাই শরীর ও প্রেম নিয়ে আমাদের আরও কথা বলা দরকার—আরও সত্য করে, আরও সুন্দর ভাষায়, আরও আলোয়। যাতে শিশুর প্রথম শিক্ষা ভয় না হয়, কিশোরের প্রথম শিক্ষক পর্নোগ্রাফি না হয়, মেয়ে নিজের রক্তকে ঘৃণা না করে, ছেলে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষমতা বলে ভুল না করে।
আনুশেহ আনাদিল সঙ্গীতশিল্পী ও উদ্যোক্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব