ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

মতামত

ট্রাম্প ও পুতিন কেন ভুলের ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন না

আমাদের ক্ষতবিক্ষত পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, দুই রাষ্ট্রনেতা—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন এমন দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যেগুলোর ইতি টানতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। ইরান ও ইউক্রেন ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাকে বলা যেতে পারে ‘ক্ষমতার ফাঁদ’। এই দুই নেতা নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি থেকে আর বের হতে পারছেন না।

দুই নেতাই ভেবেছিলেন, তাঁদের প্রতিপক্ষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করবে। দুজনই সেই উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন যে বিজয় এত সহজে আসবে না। এখনো তাঁরা বিশ্বাস করেন, পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতি তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন, যদিও পূর্ণ সাফল্যের সম্ভাবনা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। দুজনই প্রশংসা ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্নতার এক বুদ্‌বুদের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলেছেন। যতই তাঁরা পিছু হটার কাছাকাছি পৌঁছান, ততই যেন তাঁরা মনে করতে থাকেন যে তাঁরাই জিতছেন।

ট্রাম্পের এই ফাঁদে আটকে পড়ার চিত্র প্রতিদিনই আরও স্পষ্ট হচ্ছে। গত সপ্তাহে ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে এনবিসি নিউজে এক সাক্ষাৎকার চলাকালে হঠাৎ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সেট ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় সেটি যেন তাঁর (ট্রাম্প) মুখেই লেখা ছিল। ইরান সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে তিনি এতটাই হতাশ যে তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে চলমান উত্তেজনাকেও তিনি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করেন না। ওয়েলকারকে তিনি বলেন, ‘আমি এটা নিয়ে ভাবিই না।’ কিন্তু তাঁর আচরণ বলছিল সম্পূর্ণ উল্টো কথা—যেমনটা বলছিল এই সপ্তাহে তাঁর আবারও আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতায় ফিরে যাওয়া।

বাস্তবতা অস্বীকারের ক্ষেত্রে পুতিন যেন ট্রাম্পেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি এখনো ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, নিজের শর্ত চাপিয়ে দিয়ে তিনি কিয়েভকে বাধ্য করতে পারবেন। ক্রেমলিনের উপদেষ্টারা ক্রমশ সন্দেহ প্রকাশ করলেও কেউই সরাসরি তাঁর (পুতিন) মুখোমুখি হওয়ার সাহস পান না।

কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের একজন বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্টানোভায়া চলতি সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কেউই পুতিনের সামনে সন্দেহ প্রকাশ করার সামর্থ্য রাখেন না। সবাই খুব ভালো করেই বোঝেন, এমন কোনো আলোচনা তাঁর পক্ষ থেকে শীতল ও অবজ্ঞাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে। এতে আপনি এমন একজন হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন, যিনি আর পুরোপুরি তাঁর সঙ্গে নেই; বরং শত্রুপক্ষের ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।’

যেসব নেতা এই ‘ক্ষমতার ফাঁদে’ আটকে পড়েন, তাঁরা বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। কারণ, তাঁরা নিজেদের আগের ভুল স্বীকার করে সংশোধন করতে পারেন না; বরং সামনে এগিয়ে যান। তাঁরা প্রশংসাবাক্যের ওপর নির্ভর করেন। তারা ‘সফট পাওয়ার’কে অবজ্ঞা করেন, ফলে সেটিও নষ্ট করেন। পুরোনো মিত্রদের দূরে ঠেলে দেন, আর নতুন শত্রু তৈরি করতে থাকেন।

ইরান সংকটে আটকে পড়ে ট্রাম্প একদিকে ইরানি সভ্যতাকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে তেহরানকে এমন উদার শর্ত দিচ্ছেন যে তা নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় মিত্ররা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। তিনি যেন তাঁর ইরান যুদ্ধের অংশীদার বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও ছুড়ে ফেলতে প্রস্তুত। তাঁর অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য, ‘আমি যা চাইব সে তা–ই করবে’ এখন ইসরায়েলের বিরোধী শিবিরে একটি বহুল ব্যবহৃত বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে।

পুতিনের ইউক্রেন কৌশল যেন এক মাংসপেষণ যন্ত্র। গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, নিহত–আহত মিলিয়ে প্রতি মাসে রাশিয়ার ৩০ হাজারের বেশি সেনার রক্ত ঝরছে। তবু তিনি আরও সেনা পাঠিয়ে যাচ্ছেন, হয়তো কোনো অগ্রগতি আসবে, এই আশায়। তিনি সাধারণ সামরিক সমাবেশ ঘোষণা করছেন না। কারণ, তাতে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের সচ্ছল জনগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হতে পারে, এমনকি তারা বিরোধী শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এই গ্রীষ্মে তাঁর পরবর্তী ভয়াবহ কৌশল হতে পারে কিয়েভ ও অন্যান্য শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ।

পুতিন ও ট্রাম্প এগিয়ে চলেছেন। তাঁরা ইউক্রেন বা ইরানে ব্যর্থতা স্বীকার করতে পারছেন না, আবার বিজয়ের পথও খুঁজে পাচ্ছেন না। এই ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ মূল্য প্রতি মাসে বাড়ছে। আর ইতিমধ্যে মস্কো ও ওয়াশিংটন ডিসিতে রাজনৈতিক বিদ্রোহের সূচনা দেখা যাচ্ছে।

ইরানে ব্যর্থতা এড়াতে ট্রাম্পের সংগ্রাম প্রতিদিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেখানে তিনি কখনো কখনো ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিজের অবস্থান বদলাচ্ছেন। পুতিনের টালমাটাল অবস্থা তুলনামূলক কম দৃশ্যমান; কিন্তু অনেক দিক থেকেই একই রকম। ট্রাম্পের মতো তিনিও সমালোচকদের উপেক্ষা বা ভয় দেখিয়ে নিজের শিবিরে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে হতাশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ায় বিতর্কও এখন আরও খোলামেলা হচ্ছে।

প্রথমদিকের ভিন্নমতাবলম্বীদের একজন ছিলেন দিমিত্রি কোজাক। তিনি নব্বইয়ের দশক থেকে পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্রেমলিনের উপপ্রধান ছিলেন। ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ইউক্রেন আক্রমণের তিন দিন আগে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে তিনি সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানান ভ্লাদিমির সোলোভিয়ভ।

চার বছর ধরে পুতিন তাঁর সমালোচকদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন; কিন্তু এখন সেই বরফ গলতে শুরু করেছে। রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি দিমিত্রি ট্রেনিন এপ্রিল মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতা বা ভুল–বোঝাবুঝিই অপ্রয়োজনীয় সমস্যা তৈরি করবে…ইউক্রেন দেখিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বিপজ্জনক।’

সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা আসে মে মাসে ভ্যাসিলি কাশিনের এক নিবন্ধে। হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের এই গবেষক লিখেছেন, ‘ইউক্রেনে “রাশিয়াবিরোধী সরকার উৎখাতের” লক্ষ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে মৌলিকভাবে অর্জনযোগ্য নয়, যদি না পুরো দেশ দীর্ঘ মেয়াদে সামরিক দখলে রাখা হয়…আর রাশিয়ার জন্য সেটা প্রযুক্তিগতভাবেই অসম্ভব।’

ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হয়তো কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু সূত্রগুলো বলছে, সেটি অনেকটাই ২০১৫ সালের ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তির অনুরূপ হবে, যে চুক্তিটি তিনি নিজেই বাতিল করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ পরিণত হবে এমন এক ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে, যার অর্জন হবে খুব সামান্য।

পুতিন ও ট্রাম্প এগিয়ে চলেছেন। তাঁরা ইউক্রেন বা ইরানে ব্যর্থতা স্বীকার করতে পারছেন না, আবার বিজয়ের পথও খুঁজে পাচ্ছেন না। এই ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ মূল্য প্রতি মাসে বাড়ছে। আর ইতিমধ্যে মস্কো ও ওয়াশিংটন ডিসিতে রাজনৈতিক বিদ্রোহের সূচনা দেখা যাচ্ছে।

দুই নেতাই গণমাধ্যমের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। পুতিন ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছেন এবং টেলিগ্রাম অ্যাপকে দমন করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই সাংবাদিকদের আক্রমণ করছেন। ওয়েলকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘ভুয়া, নোংরা, দুর্নীতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যম।’ তবে সীমাবদ্ধতা আছে; ট্রাম্প তাঁর সব ক্ষোভ সত্ত্বেও সাংবাদিকদের সমালোচনামূলক রিপোর্টিং বন্ধ করতে পারেন না; আর পুতিন জানেন, ইন্টারনেটকে অতিরিক্ত চেপে ধরলে তা বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে।

ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ সম্ভবত ইতিহাসে বিশাল ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে, যেমন ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন ভুল সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু রাশিয়া যেন ফুটন্ত পানিভরা হাঁড়ি, যার ঢাকনা শক্ত করে আটকানো। একসময় ট্রাম্প হয়তো ইউক্রেন নিয়ে এমন একটি সমঝোতা করতে পারতেন, যা পুতিনকে তাঁর ভুল থেকে রক্ষা করত, কিন্তু পুতিন অতিরিক্ত লোভী হওয়ায় সেই সুযোগ সম্ভবত হারিয়ে গেছে।

এই দুই নেতা ক্ষমতায় এসেছিলেন নিজেদের দেশকে আবারও ‘মহান’ করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে। অথচ এখন তাঁরা এমন অপ্রয়োজনীয় ও নিষ্ফল যুদ্ধ শুরু করার পরিণতি ভোগ করছেন, যা সব পক্ষের জন্যই বয়ে এনেছে কেবল দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা।

  • ডেভিড ইগনেশিয়াস মার্কিন সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক।
    ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।