
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসক নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বেশ উৎসবমুখর আলোচনা চলছে। অনেকেই একে নতুন ধরনের ‘ডনরো নীতি’ (ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি) বলে অভিহিত করছেন। কারণ, ট্রাম্পের আগ্রাসী ও লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি উনিশ শতকে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত সেই নীতির সঙ্গে মেলে, যার মূলকথা ছিল পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু ভেনেজুয়েলায় এই হস্তক্ষেপকে শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা সমস্যাজনক। কারণ, ট্রাম্প দুবারই নির্বাচিত হয়েছিলেন এমন এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে ‘শাসন পরিবর্তন’ এবং ‘জাতি গঠন’-এর মতো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ এই কাজগুলোতেই তিনি এখন আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
এই আপাতবিরোধ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঘটে যাওয়া একটি গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই পরিবর্তন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সবকিছু তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়।
ট্রাম্প সাধারণত যেগুলো সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করতে চান, আর যেগুলো কঠিন, সেগুলো উপেক্ষা বা তোষণ করেন। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্তে ট্রাম্প শেষ কথা বললেও পুরো পরিকল্পনাটি তৈরি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, পেন্টাগন ও সিআইএ। এতে স্পষ্ট হয়—পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখার প্রশ্নে প্রশাসনের ভেতরে একটি সুসংহত ঐকমত্য রয়েছে।
নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ‘আমরা অগোলার্ধভুক্ত প্রতিযোগী শক্তিগুলোকে আমাদের গোলার্ধে সামরিক শক্তি বা হুমকিস্বরূপ সক্ষমতা স্থাপন করতে দেব না কিংবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নিতে দেব না।’
এই গোলার্ধকেন্দ্রিক শক্তি প্রদর্শনের অর্থ বুঝতে হলে ট্রাম্পের অন্য কিছু অবস্থানের দিকেও তাকাতে হয়। যেমন ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ কিংবা তাইওয়ান দখলের চীনা হুমকি নিয়ে তাঁর উদাসীনতা। কিন্তু এসব অবস্থানের পেছনে একটি অভিন্ন যুক্তি আছে। মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী অংশগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে সরে এসে নিজেদের নিকটবর্তী এলাকায় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করতে চাইছে।
এই মানসিকতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায় ট্রাম্পের আরেক উনিশ শতকের প্রেসিডেন্ট জেমস পোলকের প্রতি তাঁর প্রশংসায়। ১৮৪৬ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পোলক যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারণ করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর ছবি ঝুলছে ওভাল অফিসে।
এ কারণে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ট্রাম্পের নীতিগত বিশৃঙ্খলার প্রমাণ নয়। বরং এগুলো ইঙ্গিত করে এমন একটি প্রশাসনের দিকে, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সেই বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সীমিত এবং নিজস্ব প্রতিবেশী অঞ্চলে দেশটি ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
দুটি বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিলেও জর্জ ওয়াশিংটন ও জন কুইন্সি অ্যাডামস বিদেশি জটিলতায় না জড়ানোর যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, মার্কিন জাতীয় মানস থেকে তা কখনোই পুরোপুরি মুছে যায়নি। সহজ করে একেবারে ছোট করে বললে আজকের মার্কিন ভোটাররা অভিবাসনের বাড়বাড়ন্ত আর চাকরি বিদেশে চলে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে সাধারণত দুই বিপরীত মডেল ব্যবহৃত হয়। প্রথমটি হলো, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের অবসান’তত্ত্ব। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ফুকুয়ামা যুক্তি দিয়েছিলেন—আধুনিক যুগের প্রধান আদর্শিক দ্বন্দ্ব, অর্থাৎ উদার গণতন্ত্র বনাম কমিউনিস্ট কর্তৃত্ববাদ, চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। উদার গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে আর ইতিহাসে যা বাকি ছিল, তা মূলত কিছু বিচ্ছিন্ন কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের সামান্য প্রতিরোধ সামলানোর বিষয়।
হয়তো ট্রাম্প পিছু হটবেন। হয়তো কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও গ্রিনল্যান্ড নিজেদের মতো করে চলতে পারবে। হয়তো ন্যাটো কোনোভাবে টিকে যাবে। হয়তো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দনবাস ও ক্রিমিয়া ছিনিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন। হয়তো চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিজের ‘গ্রোসরাউম’ সম্প্রসারণের বদলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবেন। তবু আমার আশঙ্কা, উদার বিশ্বব্যবস্থা তার শেষ প্রভাতটি ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছে।
দ্বিতীয় মডেলটি পশ্চিমে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, কিন্তু চীনা রাজনৈতিক চিন্তকদের মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী। এটি জার্মান আইন-দার্শনিক কার্ল স্মিটের চিন্তা থেকে উদ্ভূত। স্মিট উদারবাদকে একটি ফাঁপা মতাদর্শ বলে মনে করতেন, যা বিতর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয় এবং বিপজ্জনক এক সর্বজনীনতার স্বপ্ন দেখে।
ইতিহাস কোনো একক, বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক রূপে এসে শেষ হতে পারে—স্মিট তা বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী উদার বিশ্বব্যবস্থা ইতিহাসের চূড়ান্ত পরিণতি নয়; এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফল। তিনি ধারণা করেছিলেন, নতুন উদীয়মান অ-উদার শক্তিগুলো নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করলে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। তিনি একে বলতেন ‘গ্রোসরাউম’—অর্থাৎ বৃহৎ আঞ্চলিক ক্ষেত্র।
১৯৩৩ সালে নাৎসি দলে যোগ দেওয়া স্মিটের মতে, স্বাভাবিক বিশ্বব্যবস্থা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি অঞ্চলে একটি প্রধান শক্তি সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিসর নিয়ন্ত্রণ করে। অঞ্চলগুলো একে অপরের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে কেবল শক্তির ভারসাম্যের ভিত্তিতে একে অপরের বৈধতা স্বীকার করে।
এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন অপ্রয়োজনীয়, এমনকি ক্ষতিকর। কারণ, আইন নিয়ে মতভেদ, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেই অর্থনৈতিক ও সামরিক সংঘাত জন্ম নেয়। স্মিটের চোখে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি এবং বিশেষ করে ন্যাটোর মতো যুদ্ধোত্তর প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার। এটি স্মিটের বিচারে সর্বজনীন নীতির ছদ্মবেশে বিজয়ীর বিচার।
স্মিট আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—নতুন শক্তিগুলো উদার ব্যবস্থার খোলা দরজা ব্যবহার করে নিজেদের শক্তিশালী করবে, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে থাকবে রাজনৈতিকভাবে বন্ধ। শেষ পর্যন্ত তারা মার্কিন সর্বজনীনতাকেই দুর্বল করবে। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার জন্ম তিনি দেখে যাননি, কিন্তু চীনের মতো এক বাণিজ্যবাদী আধুনিক শক্তি যখন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আচরণ করতে বাধ্য করে এবং আমদানি-রপ্তানি নিয়ম উপেক্ষা করে, তখন স্মিট নিশ্চয়ই এটিকে পূর্বানুমেয় বলেই দেখতেন।
সহজ করে বললে—কার্ল স্মিটের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের মতো একজন নেতার উঠে আসা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। যখন অর্থনীতি, রাজনীতি আর নিরাপত্তা নিয়ে চাপ বাড়ে, তখন এমন নেতা আসেন যিনি বলেন—সব নিয়ম বাদ দিয়ে শক্ত হাতে, একক সিদ্ধান্তে দেশ চালাতে হবে।
স্বাভাবিকভাবেই স্মিট মনরো নীতিকে আধুনিক ‘গ্রোসরাউম’ চিন্তার প্রথম উদাহরণ হিসেবে দেখতেন, কারণ এটি সর্বজনীন আইনের বদলে ভৌগোলিক আধিপত্যের ওপর দাঁড়ানো এক বিশ্বব্যবস্থার কথা বলে। উদার গণতান্ত্রিক সর্বজনীনতাকে তিনি যেহেতু অস্থিতিশীল মনে করতেন, তাই আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’গুলোকে তিনি দেখতেন সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টার অনিবার্য ফল হিসেবে।
এসব ব্যর্থতা থেকেই যে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এক মনরো-ঘেঁষা অবস্থানে ফিরে যাবে (যেখানে চীন ও রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশ থেকে
পশ্চিম গোলার্ধকে রক্ষা করাই মুখ্য), তা তাঁর প্রত্যাশার মধ্যেই পড়ত।
যুক্তরাষ্ট্রকে এই মনরো নীতি পুনঃস্থাপনের জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। এর অর্থ হতে পারে ন্যাটোর ভাঙন, ইউরোপে সশস্ত্র পূর্ব-পশ্চিম সংঘাতের বিস্তার এবং তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রতিশোধপরায়ণ সামরিক তৎপরতা।
হয়তো ট্রাম্প পিছু হটবেন। হয়তো কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও গ্রিনল্যান্ড নিজেদের মতো করে চলতে পারবে। হয়তো ন্যাটো কোনোভাবে টিকে যাবে। হয়তো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দনবাস ও ক্রিমিয়া ছিনিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন। হয়তো চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিজের ‘গ্রোসরাউম’ সম্প্রসারণের বদলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবেন। তবু আমার আশঙ্কা, উদার বিশ্বব্যবস্থা তার শেষ প্রভাতটি ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছে।
বেন স্টিল কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ