চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরানোর সুযোগ করে দিয়েছে
চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরানোর সুযোগ করে দিয়েছে

মতামত

ঢাকার পাঠ: রাজপথের শক্তি, সংসদের সমাধান

প্রায় ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশ এমন একধরনের শাসনের অধীনে ছিল, যা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলেছিল। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ায় সংসদ তার বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে প্রাণশক্তি হারিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রতিনিধিত্ব যুক্তিনির্ভর আলোচনাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। ফলে যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রটিতে ভিন্নমত প্রকাশ ও সমন্বয় হওয়ার কথা, সেটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

একটি বিশ্বাসযোগ্য সংসদের অনুপস্থিতিতে নাগরিকদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকেনি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে ভিন্নমতের কোনো জায়গা না থাকায়, তা প্রকাশের জন্য অন্য পথ খুঁজতে হয়েছে। ফলে রাজপথ কোনো বিকল্প নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়।

কিন্তু এই ক্ষেত্রটিও ছিল সীমাবদ্ধ। জনসমাবেশ প্রায়ই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগে বেশি জোর দিয়েছে। চাপ শুধু শারীরিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—গুম, নির্বিচার আটক এবং হেফাজতে নির্যাতন এক সর্বব্যাপী ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।

প্রথম দিকে মতপ্রকাশের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত ডিজিটাল পরিসরও নজরদারির আওতায় আসে। অনলাইন যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলো আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্বনিয়ন্ত্রণের একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এর সামগ্রিক প্রভাব ছিল গভীর।

এটি একটি গভীরতর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। যখন সংসদ ও রাজপথ—উভয়ই মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যর্থ হয়, তখন গণতন্ত্র তার মৌলিক সত্তা হারায়। নাগরিকদের সামনে দেশের গতিপথে প্রভাব বিস্তারের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উপায় থাকে না। এর ফল হয় হয়তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা, অথবা বিপরীত প্রান্তে গিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন বিস্ফোরণ।

বাংলাদেশের প্রতিবাদগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্নমতের প্রয়োজনীয়তা যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচিত করেছে। এগুলো দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছে যে এ ধরনের আন্দোলনকে সহজে কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দেওয়া যায় না। এ কারণেই ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়। যখন গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না, তখন ভিন্নমত প্রথমে স্থানচ্যুত হয় এবং পরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন এই ধারাবাহিকতাকে উল্টে দেওয়া। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং নিশ্চিত করা যে কোনো নাগরিকই যেন কণ্ঠহীন না থাকে, তা সে সংসদের ভেতরে হোক বা রাজপথে হোক।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি অনস্বীকার্য। এটি একটি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে এবং জাতীয় আলোচনাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে, আমাদের সম্মিলিত মনোযোগকে সংস্কারের অপরিহার্যতার দিকে নিবদ্ধ করেছে।

সাম্প্রতিক নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার, যেখানে পরিবর্তনের বিমূর্ত ধারণা একটি স্পষ্ট গণ–ম্যান্ডেটে রূপ নিয়েছে। যদিও রাজপথের আন্দোলন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-ভালভ হিসেবে কাজ করে (যেখানে ক্ষোভ প্রকাশ পায় এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়), তবু এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে না। নাগরিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে এবং প্রতিনিধিদের বৈধতা দিতে পারে একমাত্র ব্যালটের মাধ্যমেই। নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং এর সূচনা।

এ প্রেক্ষাপটেই ‘পুনর্গঠনের জন্য ভিন্নমত’ ধারণাটি তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়। সুস্থ ভিন্নমতকে ধারণ করতে হবে, সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় সৃষ্টি হবে বিশৃঙ্খলা, যার শূন্যস্থান সহজেই পূরণ করে ফেলতে পারে অরাজক গোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী প্রতিকূল শক্তি।

একটি কার্যকর গণতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই প্রকৃত সুরক্ষা নিহিত। বিশেষ করে বিরোধী দলের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর বিরোধী দল ভিন্নমত ও সিদ্ধান্তের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে। তারা জনগণের অসন্তোষকে ধারণ করে, সংগঠিত করে এবং তা নীতিগত বিকল্পে রূপান্তরিত করে। এই সেতুবন্ধ না থাকলে ভিন্নমত ঝুলন্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং তা দীর্ঘ মেয়াদে শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে না।

সাম্প্রতিক কিছু সংস্কার—যেমন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় তদারকি কমিটিগুলোর নেতৃত্বে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বিরোধী দলের কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত পরিসর নিশ্চিত করা—এই পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এগুলো কোনো ছাড় নয়; বরং এমন কাঠামোগত ভিত্তি, যা গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে শূন্য হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে।

অতএব এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া উপাদানগুলোকে আবার যুক্ত করা। প্রতিবাদ ও সংসদকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা যাবে না। প্রতিবাদ সংসদকে প্রভাবিত করবে এবং সংসদ তার প্রতিক্রিয়া জানাবে। এই সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে ভিন্নমত অস্থিতিশীলতার উৎস না হয়ে নবায়নের শক্তিতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়। যখন গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না, তখন ভিন্নমত প্রথমে স্থানচ্যুত হয় এবং পরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন এই ধারাবাহিকতাকে উল্টে দেওয়া। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং নিশ্চিত করা যে কোনো নাগরিকই যেন কণ্ঠহীন না থাকে, তা সে সংসদের ভেতরে হোক বা রাজপথে হোক।

  • রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা

    দ্য উইক ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত