
তখন আমি সবে নবম শ্রেণিতে উঠেছি। সে সময় মানুষের হাতে হাতে মুঠোফোন ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জয়জয়কারও ছিল না। হঠাৎ একদিন বাসায় কুরিয়ারে আমার নামে বেশ বড় ও ভারী একটি খাম এল। এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। প্রেরকের নাম-ঠিকানাও অজ্ঞাত।
সবার সামনেই খামটি খোলা হলো। ভেতর থেকে বের হলো বেশ কিছু উপহারসামগ্রী। সঙ্গে একটি চিঠি। চিঠির নিচে যে নামটি লেখা, সেই নামটি আমার অপরিচিত। চিঠিটি পড়ার পর আমার মা-বাবার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। আমাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘তোমার কাছে কেন এটা এসেছে?’
আজ এত বছর পরও সেই প্রশ্নটির কথা মনে আছে। কারণ, সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম না কী আমার অপরাধ। কোনো অপরাধ না করেও আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। লজ্জায় তখন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা করছিল। নিজের অজান্তেই নিজেকে ধিক্কার দিতে শুরু করলাম আমি। মনে হয়েছিল, নিশ্চয়ই আমার কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। নাহলে এমন একটি চিঠি আমার কাছে আসবে কেন! নিজের আত্মবিশ্বাস যেন একমুহূর্তে দুমড়েমুচড়ে গেল। বুঝতে পারছিলাম না, অপরাধী আসলে কে?
এভাবেই ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতি, অপরাধের শিকার মানুষটির আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে তার চরিত্র, আচরণ, পোশাক, পরিবার কিংবা জীবনযাপন নিয়ে বারবার প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে।
প্রশ্ন হলো, ভুক্তভোগীকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রয়োজনটা আসলে কার? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুব জরুরি। ভিকটিম ব্লেমিংয়ের পেছনে কাজ করে মূলত সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো, যে কাঠামো সব সময় দুর্বলকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এই ক্ষমতাকাঠামো এতটাই শক্তিশালী, তা অপরাধীর আচরণ ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীর আচরণ বিশ্লেষণ করতে শুরু করে।
‘ভুক্তভোগী কেন সেখানে গিয়েছিলেন? পরিবার তাঁকে কেন দেখভাল করেনি? তিনি আগে কেন বলেননি? তাঁর পোশাক কেমন ছিল? তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?’ এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে বারবার আসে আর এসব প্রশ্নের ধূম্রজালের আড়ালে অপরাধীর অপরাধ ধীরে ধীরে আলোচনার আড়ালে চলে যেতে থাকে। ভুক্তভোগীকে সন্দেহ করা যত সহজ হয়, অপরাধীর অপরাধের দায় ততই হালকা হতে থাকে।
আমাদের প্রশ্ন করার ধরন বদলাতে হবে। ‘তার সঙ্গে কেন এমন হলো?’ এই প্রশ্নের পরিবর্তে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে ‘কে তার সঙ্গে এমন করল এবং কেন করল?’ ‘সে সেখানে কেন গিয়েছিল?’ এর বদলে প্রশ্ন করতে হবে, ‘অপরাধী সেখানে গিয়ে কী করেছে?’, ‘সে আগে কেন বলেনি?’ এর পরিবর্তে আমাদের জানতে হবে, ‘কেন আমরা নিরাপদে কথা বলার একটি পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম?’
নারীর প্রতি ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে, তা হলো এই সংস্কৃতি শিশুদের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা হয় শিশুটির মা-বাবার জীবনযাপন, শিক্ষা, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সন্তান পালনের দক্ষতার দিকে। অপ্রতিম কিংবা সাম্প্রতিক আলোচিত শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোয় আমরা দেখেছি, অপরাধের ঘটনার পরও আলোচনার একটি অংশ কীভাবে ভুক্তভোগী এবং তাঁর পরিবারের দিকে ঘুরে যায়।
শিশুর প্রতি ঘটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পরিবর্তে আমরা শিশুর আচরণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছি এবং শিশুর প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করছি। ভাবতে অবাক লাগে, একটি শিশুর পোশাক কিংবা আচরণ কখনো কাউকে তার বিরুদ্ধে সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয় না, একটি শিশুর অবাধ্যতা কখনো কাউকে তাকে আঘাত করার অধিকার দেয় না, কোনো শিশুর একা ঘরের বাইরে যাওয়া কাউকে তাকে অপহরণ করার বৈধতা দেয় না, কোনো শিশুর কারও সঙ্গে কথা বলা তাকে নির্যাতনের অনুমতি দেওয়া নয়।
আদালতে দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই যেন অপরাধের রায় হয়ে যায়। আর সেই রায়ে অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয় বেশি, যা পরবর্তী সময় বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এভাবে একজন ভুক্তভোগীকে দফায় দফায় লড়তে হয় তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধের বিরুদ্ধে, সামাজিক সন্দেহের বিরুদ্ধে, এরপর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে।
সামাজিক এই ব্যাধিকে আমাদের রুখে দিতেই হবে। আর এই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে। পুলিশ, হাসপাতাল, আদালত, স্কুল, পরিবার, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগকারীর চরিত্র নয়; বরং অভিযোগের তথ্য ও প্রমাণ তদন্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় রিপোর্টিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় মানসিক ও আইনি সহায়তা এবং যেখানে প্রয়োজন, সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের এমন অনেক উদাহরণ তৈরি করতে হবে, যা মানুষকে অভিযোগ করতে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহিত করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের প্রশ্ন করার ধরন বদলাতে হবে। ‘তার সঙ্গে কেন এমন হলো?’ এই প্রশ্নের পরিবর্তে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে ‘কে তার সঙ্গে এমন করল এবং কেন করল?’ ‘সে সেখানে কেন গিয়েছিল?’ এর বদলে প্রশ্ন করতে হবে, ‘অপরাধী সেখানে গিয়ে কী করেছে?’, ‘সে আগে কেন বলেনি?’ এর পরিবর্তে আমাদের জানতে হবে, ‘কেন আমরা নিরাপদে কথা বলার একটি পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম?’
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই পরিবর্তন হবে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর ওপর অপরাধ ঘটলে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। একজন নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর পোশাক, হাসি, চলাফেরা কিংবা জীবনযাপনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। আর একটি পরিবার তাদের সন্তানকে হারালে, সেই শোকের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের বিচার করা যায় না। অপরাধের শিকার হওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না। বিচারের কাঠগড়াটি তাই সঠিক জায়গায় রাখতে হবে।
● নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী
purba_du@yahoo.com