মতামত

আমাদের ‘প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা’ কেন থাকবে না 

অনেক সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। বিশেষ করে যখন প্রযুক্তিকে ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়। তবে প্রায় ৩০ বছর সামরিক বাহিনী, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করার পর একটা কথা বুঝেছি, আমাদের সরকার সবকিছুই করে, কিন্তু প্রযুক্তির দিকে হাঁটতে চায় না। এটা আমাদের পুরোনো রোগ। আমরা ভাবি, এগুলো বোঝার মেধা আমাদের নেই। শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, কৃষি থেকে শুরু করে জ্বালানি—প্রতিটি জায়গায় প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়া যায়। কিন্তু আমরা সেটা মন থেকে বিশ্বাস করতে পারিনি।

আমাদের একটা বড় সুবিধা হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। পৃথিবীর অনেক দেশ এখন বয়স্ক মানুষের ভার বহন করছে। জাপান পারছে না, ইউরোপের অনেক দেশ পারছে না। বাংলাদেশে সেই সমস্যা নেই। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ এখনো তরুণ, কর্মক্ষম এবং পরিবর্তনের জন্য উদ্‌গ্রীব।

কিন্তু এই তরুণ প্রজন্মকে আমরা সুযোগ দিতে পারছি না। পৃথিবী যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর অটোমেশনে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে, সেখানে শুধু কর্মক্ষেত্র তৈরি করলেই হবে না। সর্বজনীন ন্যূনতম ভাতার ব্যাপারেও ভাবতে হবে। কারণ, অটোমেশন যত বাড়বে, কিছু কাজ তত কমবে। এই দুটোর মধ্যে ব্যালান্স বা ভারসাম্য আনতে হলে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার ছাড়া কোনো পথ নেই।

বাংলাদেশের একজন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা পেতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এটুকু জানি, যত দেরি হবে; তত বেশি সম্ভাবনা নষ্ট হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে সেই প্রযুক্তির ভিত্তিটা কোথায়? উত্তর আমাদের হাতের কাছেই আছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ এমন একটা সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে, যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও এখনো পারেনি। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সিস্টেম, এটা সত্যিকার অর্থেই ঈর্ষণীয়।

ভারত এই কাজ করেছে আরও পরে, আধার কার্ড দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো এ ধরনের একক পরিচয়পত্র সিস্টেম বা ব্যবস্থা নেই। এই একটা ব্যবস্থা দিয়েই মুঠোফোনের বায়োমেট্রিক সিম রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, অপরাধমূলক কার্যক্রম অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে। ব্যাংক খাতে কেওয়াইসিতে বাধ্যতামূলক করার পর ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট অনেক সহজ হয়েছে। কোভিডের সময় সুরক্ষা অ্যাপে এই জাতীয় পরিচয়পত্রের সবচেয়ে ভালো ফল আমরা

দেখেছি। লাখ লাখ মানুষ টিকা পেয়েছে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু এরপরও এই ব্যবস্থাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছি না। এটাই সবচেয়ে বড় আফসোস।

একটা উদাহরণ দিই। মুঠোফোনের সিডিআর, মানে কল ডিটেইল রেকর্ড। একজন মানুষ প্রতিদিন কতক্ষণ কথা বলে, কত টাকা রিচার্জ করে, দিনে কোথায় থাকে, রাতে কোথায় ঘুমায়, বছরে কয়বার বিদেশে যায়—সব তথ্য এই রেকর্ডে থাকে। রাষ্ট্র চাইলে মুঠোফোন নম্বর আলাদা রেখে শুধু এই ডেটা দিয়েই বুঝতে পারবে কে আসলে সুবিধাবঞ্চিত। যে মানুষটা মাসে ৫০ টাকাও রিচার্জ করতে পারে না, সে যে গরিব, সেটা বুঝতে কোনো সার্ভে লাগে না। মেশিন লার্নিং এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সঠিক সুবিধাবঞ্চিতদের বের করে ফেলতে পারে একনিমেষেই। কোভিডের সময় ঠিক এই পদ্ধতিতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের খোঁজে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয় ভাতার বিতরণ নিয়ে ঘাঁটলে এর পেছনের ধারণা পাওয়া যাবে।

এখন ফ্যামিলি, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য কার্ড নিয়ে কথা হচ্ছে। এই কার্ডগুলোর আইডিয়া নতুন নয়, ২০ বছর আগে থেকেই ছিল। এগুলো আসলে এখন সামনে নিয়ে আসা হয়েছে মাত্র। এর পেছনের আসল মূল ভূমিকা রাখতে পারে একটাই জিনিস—একীভূত জাতীয় পরিচয়পত্র। সেটা ঠিকমতো না থাকলে এই কার্ডগুলো সামনে ঝামেলাই তৈরি করবে। একই মানুষ একাধিক কার্ড নেবে, সিস্টেম ফাঁকি দেবে আর সরকার বলতে বাধ্য হবে প্রকল্প সফল হয়েছে। সরকারের এই মানবিক ধারণাকে বাস্তবমুখী করার প্রযুক্তি দেশের ভেতরেই আছে।

সমাধানের রাস্তায় হাঁটি বরং। সেটার জন্য সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটা হলো, আমরা কেন একটা সর্বজনীন অ্যাপ দিয়ে আজকে তেলের রেশনিং, কালকে খাদ্যশস্য, পরশু গ্যাস বিতরণ করতে পারছি না? সিভিল রেজিস্ট্রেশন আর ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (সিআরভিএস) ডেটাবেজ তো রাষ্ট্রের কাছেই আছে। দেশের ভেতরেই এমন সফটওয়্যার কোম্পানি আছে, যারা বিদেশি কোম্পানির কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ অনেক কম খরচে করে দিয়েছে। তারপরও আমরা বিদেশি কোম্পানির পেছনে ছুটি। আমরা কি সেটা জানি না, নাকি জেনেও চোখ বন্ধ রাখছি?

আমাদের জন্য প্রযুক্তি দেশের বাইরে নেই। প্রযুক্তি দেশের ভেতরেই আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের একজন ‘প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা’ নেই যে এই বিষয়গুলো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সবাই কাজ করছে, কিন্তু কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। একটা মন্ত্রণালয় একটা ব্যবস্থা তৈরি করে, আরেকটা মন্ত্রণালয় আরেকটা ব্যবস্থা নিয়ে আসে, কিন্তু দুটো কখনো একসঙ্গে কথা বলে না। রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রযুক্তির কোনো মালিক নেই।

বাংলাদেশের একজন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা পেতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এটুকু জানি, যত দেরি হবে; তত বেশি সম্ভাবনা নষ্ট হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। সুযোগ না পেলে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাবে। আর আমরা বসে বসে দেখব এবং বলব, মেধা পাচার হয়ে গেছে।

রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক লেখক

* মতামত লেখকের নিজস্ব