মতামত

ভোট টানবে নারী, কিন্তু প্রার্থী হতে পারবে না!

ইংরেজির ‘এক্স’ অক্ষরটি সব সময়ই রহস্যময়। অজানা, প্রাক্তন, প্রাপ্তবয়স্ক কত কত অর্থে যে এক্স শব্দের প্রচলন আছে তার ইয়ত্তা নেই। যাহোক সামাজিক যোগযাযোগমাধ্যম এক্স এখন বাংলাদেশিদের তর্ক–বিতর্ক–কুতর্কের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ডেস্কটপের উত্তাপ বাস্তব জগতেও নেমে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত শনিবার বিকেলে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডলে ইংরেজিতে একটি পোস্ট দেওয়া হয়, যার একটি অংশের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যখন নারীদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তাঁরা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। এটি অন্য কিছু নয়; বরং পতিতাবৃত্তির অন্য একটি রূপ।’

জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট অত্যন্ত ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হ্যাক করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রশ্ন তুলেছে, হ্যাকড হওয়ার কিছুক্ষণ পরই অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার দাবি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে সত্য–মিথ্যা যাচাইয়ের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে বয়ান তৈরি করাটাই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। পরপর তিনটি একতরফা, রাতের ভোট এবং আমি–ডামির নির্বাচনের পর দেশে একটি নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যদিও জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা, ভয় ও উদ্বেগ কাটেনি। দেশের প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ ভোটারের বড় অংশ ভোট দিলেও সমস্যা, ভোট না দিলেও সমস্যা—এই দ্বিধায় আটকে রয়েছেন।

সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আলোচনায় উঠে এসেছে, ভোটের সমীকরণে প্রায় ৮০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। তবে দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২ হাজার ১৭ প্রার্থীর মধ্যে এবারের নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার প্রার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মাত্র ৮০ জন; এর মধ্যে ১২ জন প্রার্থীই স্বতন্ত্র। এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ২২টি দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী দিয়েছে। সিপিবি ১৭ জনকে প্রার্থী করেছে, বিএনপি দিয়েছে ৬ জনকে, জামায়াত ১ জনকে প্রার্থী করেছে।

ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায় নাহয় জনসংখ্যার বিচারে সংখ্যালঘু; কিন্তু নারীরা তো দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী। পুরুষের তুলনায় তাঁদের সংখ্যা ১৬ লাখ বেশি। যদিও সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকায় নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় ২০ লাখ কম; কিন্তু দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে এবার নারী প্রার্থী মাত্র ৭৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ৬১ জন, আর স্বতন্ত্র ১৭ জন। জামায়াতসহ ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বিএনপি ১০ জন নারীকে প্রার্থী করেছে। এর বাইরে সিপিবি, বাসদসহ বাম দলগুলো কয়েকজন নারীকে প্রার্থী করেছে।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্ভুক্তি ও বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিশ্রুতি সবখানেই জোরালোভাবে শোনা গেলেও গত ১৭ মাসে যে জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক করে তোলা হয়েছে, তারা নারী। ভোটের মাঠেও যে নারীবিদ্বেষী পরিবেশ, সেটি আগের ১৭ মাসেরই ধারাবাহিকতা। এ সময়ে নারীর পরিসর সংকুচিত হয়েছে, সামনের কাতারের মুখগুলোকে বেছে বেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে হেট ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ঘরের বাইরে বা জনপরিসরেও নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছেন নারীরা। অনলাইন ও বাস্তব—দুই জগতের মব সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়টি রাজনৈতিক দল?

এটা সত্য যে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বড় দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী দুজন নারী থাকলেও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ একেবারেই গৌণ। বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনেই নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৫ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। নারীরা যাঁরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তাঁদের হাতে গোনা কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগই বাবা, স্ত্রী কিংবা সন্তান কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন। নির্বাচিত হয়েছেন। এর বাইরে সংরক্ষিত আসনগুলো নারীর শোপিস প্রতিনিধিত্ব হিসেবে থেকে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কারের জন্য গঠিত ঐকমত্য কমিশনও নারীকে বাদ রেখেই নারীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে অভিযোগ রয়েছ। বহু মন–কষাকষি, দর–কষাকষির পর ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থীর মনোনয়নের ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছে। দলগুলো তো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেই নির্বাচনে এসেছে। তাহলে কেন তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে? যাঁরা বলছেন ও প্রচার করছেন, হ্যাঁ ভোট জিতে গেলেই বাংলাদেশের রাজনীতি গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করবে, তার নিশ্চয়তা আসলে কী? প্রকৃতপক্ষে যে দলই ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসুক, সনদে যা–ই লেখা থাকুক না কেন, তারা তাদের সুবিধামতো করে সিদ্ধান্ত নেবে। নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে বয়ান তৈরি করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করবে।

এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দিয়েছে। এঁদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে নয়; বরং পারিবারিক সূত্রে মনোনয়ন পেয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী একজন নারীকেও প্রার্থী করেনি। সম্প্রতি আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তাঁদের দলের নেতৃত্বে কোনো নারী আসতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, নারীদের প্রার্থী করার ব্যাপারে তাঁর দল প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নানা নাটকীয়তা ও দর–কষাকষির পর রাজনীতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এনসিপি ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট করে। জোট করার আগে এনসিপি ১২৫ জন প্রার্থীর তালিকা করেছিল, সেখানে ১৪ জন নারী ছিলেন। জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পর দল থেকে বেশ কয়েকজন নারী রাজনীতিক পদত্যাগ করেন। এবারের নির্বাচনে তাঁদের নারী প্রার্থী দুজন।

জামায়াতে ইসলামীর কয়েক হাজার নারী কর্মী কয়েক মাস ধরে নির্বাচনের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা নারী ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন। যদিও তাঁদের বিরুদ্ধে ভোট টানার কৌশল হিসেবে ধর্মের ব্যবহার এবং কোথাও কোথাও ভোটারদের এনআইডি কার্ড সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। আবার ভোটের প্রচার করতে গিয়ে কোথাও কোথাও তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জামায়াত নেতৃত্বের প্রচারের একটি প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটের প্রচারে গিয়ে তাদের নারী কর্মীদের বাধা পাওয়ার বিষয়টি।

ভোটের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর বিএনপির নারী কর্মীরাও আসনগুলোতে চষে বেড়াচ্ছেন। কুষ্টিয়ায় একজন প্রার্থীর চীনা স্ত্রীর প্রচারণা জনগণের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি করেছে। অনেক আসনেই প্রার্থীর স্ত্রী নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন।

ভোটের প্রচারণায় নারীরা থাকলেও কোথাও কোথাও প্রার্থী ও নেতারা নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য ও আচরণ করতে পিছপা হচ্ছেন না। অভিযোগ উঠেছে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে বরিশাল–৫ আসনে বাসদের একজন নারী প্রার্থীর সঙ্গে একমঞ্চে বসতে রাজি হননি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী। বরগুনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে দলটির একজন নেতা বলেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে, যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটি ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।’ এ বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ জন্ম হলে তাঁকে দলের সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ডিজিটাল পরিসরে নারী প্রার্থী ও নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচারণায় ভরে ভয়াবহভাবে বেড়েছে। নারীবিরোধী ‘গালিযুদ্ধ’ এখন কারও কারও রাজনীতির জনপ্রিয় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত ‘হেট ক্যাম্পেইন’ যে ভোটার টানার বড় একটি অস্ত্র, ভারতের নরেন্দ্র মোদি ও আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বড় দৃষ্টান্ত।

রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, তাঁরা নারীর অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে চান। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীর মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে তাঁরা যদি আন্তরিকই হোন, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বটবাহিনী’ তাঁরা পোষেন কেন।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্ভুক্তি ও বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিশ্রুতি সবখানেই জোরালোভাবে শোনা গেলেও গত ১৭ মাসে যে জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক করে তোলা হয়েছে, তারা নারী। ভোটের মাঠেও যে নারীবিদ্বেষী পরিবেশ, সেটি আগের ১৭ মাসেরই ধারাবাহিকতা। এ সময়ে নারীর পরিসর সংকুচিত হয়েছে, সামনের কাতারের মুখগুলোকে বেছে বেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে হেট ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ঘরের বাইরে বা জনপরিসরেও নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছেন নারীরা। অনলাইন ও বাস্তব—দুই জগতের মব সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়টি রাজনৈতিক দল?

ভোটের মাঠে এসে দেখা যাচ্ছে, নারীদের প্রার্থী করার প্রশ্নে যাঁরা ‘না’ বলছেন, তাঁরাই আবার ভোটার টানার ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ কৌশলের ব্যবহার করছেন। এটা তো রাজনৈতিক দ্বিচারিতাই।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

  • মতামত লেখকের নিজস্ব