বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে গত ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট নির্বাচনের আগের রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তারা ব্যালট কেটে বাক্স ভর্তি করেছেন বলেও তারা অভিযোগ করেছে।অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
দলীয় সরকারের অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব, সেটা ইসি ভোটের দিনের আগে ও পরে জনগণের চোখে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারল কি না সেই প্রশ্ন উঠবে। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, সংসদে কারও যোগ্যতা ধরে রাখা প্রার্থিতার মতোই একটি ধারাবাহিক প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। নির্বাচনে অংশ নিতে যোগ্যতা ও তা টিকিয়ে রাখা একই সূত্রে গাঁথা। শপথ নিয়ে সংসদে বসে যাওয়া কোনো বিশেষ অধিকার তৈরি করে না।
আমরা আশা করব, অংশগ্রহণমূলক এবং তুলনামূলকভাবে কম সহিংস পরিবেশে অনুষ্ঠিত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফলে যে অস্বাভাবিক চিত্র উঠে এসেছে এবং এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে তদন্ত করে দেখার পক্ষে দৃঢ় মত ব্যক্ত করেছে, সেসব বিষয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি বিবেচনায় নেবে। তাদের মনে রাখতে হবে, গোটা ইসি ৩০ ডিসেম্বরের ফলাফলের পক্ষে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছে বলেই সব প্রশ্নের ফয়সালা ঘটেছে, তা বলা যাবে না। কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সাফাই বক্তব্য অস্বাভাবিকতারই ইঙ্গিতবহ কি না, তা–ও হয়তো প্রশ্নের বাইরে নয়।
বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে দুর্নীতি করার প্রবণতার মূলে ঐতিহ্যগত কিছু কারণ আছে। সেটি হলো যেকোনো ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে একবার প্রজ্ঞাপন জারি এবং শপথ নিতে পারলেই পাঁচ বছরের জন্য জনপ্রতিনিধি থাকার নিশ্চয়তা। নির্বাচনী মামলা দায়ের করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রতিকার পাওয়ার অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। গত ৪৭ বছরে হাতে গোনা কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর সাফল্যজনকভাবে আইনি লড়াই চালিয়ে সুফল পাওয়া গেছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দিনে ফলাফল উল্টে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম যাতে না ঘটতে পারে এবং ঘটলেও তা সাফল্যের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করা যায়, সে বিষয়ে আইনপ্রণেতারা কখনোই গুরুত্ব দেননি। তাঁরা আসলে মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রেখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে সব সমস্যার জাদুকরি সমাধান আশা করেছিলেন।
আমরা মনে করি, অন্তত ত্রিমুখী প্রতিকারের আইনি পথ খোলা আছে। প্রথমত, হাইকোর্টের বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে মামলা করা। ছয় মাসের মধ্যে রায় যাতে হয়, সেটা সব পক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। বিচার শুরু হলে যেন অহেতুক মুলতবি না হয়। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের সরল বিশ্বাসে করা কাজের জন্য তাঁদের কৈফিয়ত নেওয়া যাবে না। কিন্তু এর বাইরে তাঁরা যেখানে যা করেছেন, তা প্রমাণ করা গেলে অনধিক সাত বছর এবং অন্তত ছয় মাস বা এক বছর জেলের বিধান আছে। তবে এ ধরনের মামলা অপরাধ সংঘটনের ছয় মাসের মধ্যে করা যাবে। আশা করব, যেসব মামলা দায়ের ইসির পূর্বানুমোদন লাগবে, সেটা তারা দেবে। তৃতীয়ত, ইসি এবারের নির্বাচনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘অভিযোগ পেলে’ ব্যবস্থা নেওয়ার মতো একটি পলায়নপর নীতি অনুসরণ করেছে। এতে তাদের স্বাধীন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা স্বপ্রণোদিতভাবেও তদন্ত করতে পারে।
এবারের ফলাফল কেন আগের সব রেকর্ড তছনছ করেছে, তারও একটা সমীক্ষা চালানো এবং তার ফলাফল মানুষকে জানানো ইসির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর বিপুল ভোটে জয়ী সরকারের উচিত হবে, ইসিকে উল্লিখিত কাজে সত্যিকারের সহায়তা দেওয়া।