চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ চালুর পর থেকেই পর্যটক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রেনযাত্রা নিয়ে একধরনের স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। সড়কপথের দীর্ঘ ভোগান্তি এড়িয়ে নিরাপদে কক্সবাজার যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন এই রেলপথ দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, চালুর পর থেকেই এই রেলপথে চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে পাথর ও ইটের টুকরা নিক্ষেপ শুরু হয়। গত দেড় বছরে ৫০টির বেশি নথিভুক্ত পাথর নিক্ষেপের ঘটনা এবং যাত্রীদের গুরুতর আহত হওয়ার চিত্র এই রেলপথের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনায় গত কয়েক মাসে ৯ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীরা রক্তাক্ত হয়েছেন, কারও মাথা ফেটেছে তো কারও দাঁত ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেনের জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি যাত্রীদের সার্বক্ষণিক আতঙ্ক তৈরি করছে। রেল কর্তৃপক্ষ এখন এই অপরাধ ঠেকাতে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করছে। নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মূল সমস্যা বন্ধে শুধু এই উদ্যোগেই থেমে থাকলে চলবে না।
রেলওয়ের পক্ষ থেকে স্থানীয় এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা, সভা ও অপরাধীদের ধরিয়ে দিলে আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা—যেমন রামু, চকরিয়া, লোহাগাড়া ও হারবাংয়ে নিয়মিত এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ রেলপথে নিয়মিত ট্রেনযাত্রীদের এমনও অভিযোগ আছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী যাত্রী ও পর্যটকদের ট্রেনযাত্রায় নিরুৎসাহিত করতে বাসমালিকদের কেউ কেউ এ ঘটনার ইন্ধন দিচ্ছেন। এমন অভিযোগ কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে স্থানীয় বখাটে ও নেশাগ্রস্ত অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে মাঠপর্যায়ের নজরদারি কতটা কার্যকর, তা–ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের অপরাধে জেল, জরিমানাসহ কঠোর শাস্তির কথা বলা আছে এ–সংক্রান্ত আইনে। কিন্তু এ আইন কাগজে-কলমেই থেকে যায়, বাস্তবে এর প্রয়োগ খুব বেশি হয় না। ফলে অপরাধীরা একধরনের বিচারহীনতার সুযোগ পাচ্ছে। ট্রেনে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির পাশাপাশি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও এখানে যুক্ত করতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ব্যবহার করে দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের পথ নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।