সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী

পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং গ্রামে কোল জাতিসত্তার পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি আমাদের উন্নয়নের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক নির্মম সত্যকে আবারও সামনে এনেছে। ২৫ বছর ধরে বসবাস করা ভিটে থেকে উচ্ছেদ হয়ে তাঁরা আজ নিজ দেশেই উদ্বাস্তু। আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে এই উচ্ছেদ করা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে খোলা আকাশের নিচে একদল মানুষকে ছুড়ে ফেলা কতটা মানবিক? স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুখ থেকেও যখন ‘কী করার আছে’ এমন অসহায় উক্তি বের হয়, তখন রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

গোদাগাড়ীর এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং এটি সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ভূমিহীনতার একটি করুণ উদাহরণ মাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ভূমিহীন। পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইনপল্লি থেকে শুরু করে মধুপুরের গারো জনপদ—সবখানেই চলছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও জমি দখলের ঘটনা। ১৯৩০-এর দশকে যেখানে উপকূলীয় অঞ্চলে ২৩৭টি রাখাইন গ্রাম ছিল, আজ তা বিলুপ্তির পথে। জাল দলিল, হুমকি আর আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই প্রান্তিক মানুষদের পৈতৃক ভূমি থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি সুরক্ষায় ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’-এর ৯৭ ধারা থাকলেও তার প্রয়োগ কার্যত শূন্য। রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া এসব জমি হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও প্রভাবশালীরা তা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। মধুপুর শালবনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা গারোরা আজ বন বিনাশের মামলার বোঝা নিয়ে উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ সেই বনের জমি দখল করে বাঙালিদের বাণিজ্যিক বাগান তৈরিতে প্রশাসনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

রাখাইন অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘সরকার বদলালে দখলদারও বদলায়, দখলদারি বন্ধ হয় না।’ এই নির্মম সত্যটিই আজ সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্মশানের জমিও আজ সুরক্ষিত নয়। এই জনগোষ্ঠীগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের প্রতিটি সূচকে পিছিয়ে পড়ছে কেবল তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি ‘ভূমি’ হারিয়ে ফেলার কারণে।

আমরা মনে করি, কেবল শোক প্রকাশ বা টিন বিতরণ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার সুরক্ষায় অনতিবিলম্বে একটি ‘পৃথক ভূমি কমিশন’ গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি খাসজমি বণ্টনের ক্ষেত্রে এই প্রান্তিক ও ভূমিহীন মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া কেবল আদালতের রায়ের আক্ষরিক প্রয়োগ নয়, বরং তাদের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করাও বড় দায়িত্ব।