বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে। চাপ শুধু রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে আসছে তা নয়; নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও এখানে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এই চাপ আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ভেতরের অনৈক্যের কারণে। ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের কণ্ঠে যে উদ্বেগ উঠে এসেছে, তা আসলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা একটি বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। এই সম্মিলন থেকে যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখার ঘোষণাটি তাই সময়োপযোগী ও জরুরি বার্তা বহন করে।
সংবাদপত্রে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়; এগুলো আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আক্রমণ। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক নয়; এটি সংগঠিত এবং পরিকল্পিত। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর এই হামলাকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলেছেন। এই বাস্তবতায় কোনো গণমাধ্যমের নিজেকে নিরাপদ ভাবার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই হুমকির মুখে গণমাধ্যম কতটা ঐক্যবদ্ধ? সম্মিলনে বারবার যে কথাটি উঠে এসেছে—অনৈক্যই গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। রাজনৈতিক বিভাজন, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, মালিকদের স্বার্থ, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে সাংবাদিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই বিভক্ত। এগুলোর সুযোগই নেয় ক্ষমতাকেন্দ্র, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষীরা।
সম্মিলনে বারবার উঠে এসেছে যে ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যই গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি। গণমাধ্যম সেই বৈচিত্র্যের প্রধান বাহন। কিন্তু গণমাধ্যম যদি ভয়ভীতির কারণে নীরব হয়ে পড়ে, তবে অপরাধ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অবাধে ছড়িয়ে পড়বে। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির পূর্বশর্ত।
সম্মিলনে দেওয়া প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানের বক্তব্য আমাদের পেশাগত মর্যাদা ও আত্মসমালোচনার প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাংবাদিকতাকে দালালি বা দলবাজির অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল বাইরের চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই হবে না; ভেতরের ক্লেদও পরিষ্কার করতে হবে। আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা, নৈতিক মানদণ্ড এবং পেশাগত আচরণবিধি শক্তিশালী না হলে ঐক্য টেকসই হবে না। ঐক্য যেন কোনো শূন্যগর্ভ স্লোগান না হয়—এই সতর্কতা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্যে স্বাধীন গণমাধ্যমের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বটি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সরকার, প্রশাসন কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় ক্ষমতার প্রশংসার বলয়ে আবদ্ধ থাকে; সত্য কথাটি বলার সাহস দেখায় স্বাধীন সাংবাদিকতাই। এ কারণেই সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠান একে অপরের পরিপূরক। আদালত অবমাননা বা আইনি ক্ষমতা যেন কখনোই সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের হাতিয়ার না হয়—গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই এটা জরুরি।
এ রকম প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া একটি গভীর হতাশার বিষয়। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন নিয়ে সর্বসম্মত সমর্থন থাকার পরও তা কার্যকর না হওয়া প্রমাণ করে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক কত বেশি। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি জরুরি প্রয়োজন। যে সরকার বা রাষ্ট্র সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাকে সেই ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।
সব মিলিয়ে গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬ আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরেছে—স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষার লড়াই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি সমগ্র সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত লড়াই। এখন সময় এসেছে বিভাজনের দেয়াল ভেঙে, নৈতিক ও পেশাগত সংস্কারের পথে এগিয়ে একসঙ্গে দাঁড়ানোর। ঐক্যের প্রশ্নটি আর নৈতিক আহ্বান নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।