সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পুলিশের কনটেন্ট তৈরি

বিদ্যমান নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের কিছু সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় ভিডিও ধারণ করে তা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। এসব ভিডিওর কোনোটি সচেতনতামূলক, কোনোটি মানবিক সহায়তার নামে তৈরি, আবার কোনোটি অভিযান ও আটকের দৃশ্য। অনেক ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হচ্ছে। এতে পুলিশের কিছু সদস্য যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠছেন। একটি পেশাদার ও সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য হিসেবে এমন কর্মকাণ্ড সব দিক বিবেচনায় অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য।

সম্প্রতি এক নারী স্কুটিচালককে হেলমেট না পরার কারণে পুলিশ থামিয়ে যে কথোপকথন করেছে, তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই ভিডিওটি প্রকাশ করেছেন। জনসচেতনতা তৈরি হোক আর মানবিক সহায়তা হোক কিংবা আটকের দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হোক, এটি পুলিশের বিদ্যমান নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এ স্পষ্ট করে বলা আছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য তাঁর অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও বা স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করতে পারবেন না। দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকাকে অসদাচরণ ও কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব নিয়ম অমান্য করলে সেটা অপেশাদার আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, নীতিমালা থাকার পরও এমন ঘটনা ঘটছে কীভাবে? অনুসন্ধানে পুলিশ সদস্যদের পরিচালিত ১০৭টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়ার কথা জানা গেছে। এসব অ্যাকাউন্টের কোনো কোনোটির অনুসারী লাখ লাখ। সেখানে অভিযান, আটক, নাগরিকের ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা পুলিশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। কোনো কোনো ভিডিওতে আটক ব্যক্তিকেও ক্যামেরার সামনে হাজির করা হচ্ছে।

পুলিশের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা; কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা নয়। ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করা পুলিশের কাজ নয়। অভিযানকালে তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ ভিডিও ধারণ করতে পারে; কিন্তু সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্রও বলেছেন, পুলিশের পোশাক পরে কনটেন্ট তৈরির সুযোগ নেই এবং এ ধরনের ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি কি যথেষ্ট পদক্ষেপ? পুলিশ সদস্যরা যদি নিজেদের জন্য তৈরি করা নীতিমালা নিজেরাই না মানেন, তাহলে কীভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন? আমরা মনে করি, পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দায়িত্ব পালনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করার বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।

নানা অপরাধ ও আইনি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটি হতে হবে পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোশাক ও ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সেটা দ্রুত তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।