সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ

ইউজিসিকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন ১৫ মাসে যেভাবে তড়িঘড়ি করে চার শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে; সেটাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক নিয়োগপ্রক্রিয়া বলা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকদের একাংশ এই নিয়োগকে স্বজনপ্রীতি ও একটি গোষ্ঠীর নিজেদের দল ভারী করার অভিযোগ তুলেছে।

শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঁচজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। সব আমলেই বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এর জন্য কাউকেই জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। বর্তমান প্রশাসনও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা ও মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীতি নিতে অনেকটাই ব্যর্থ হলো।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৫ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ৫৫০ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন। এর মধ্যে ৪০৩ জনকে এরই মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদেরও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এত বড়সংখ্যক নিয়োগের নজির এই প্রথম। এর আগে অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদে চার বছরে ৫৯৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম উপাচার্যের কাছে চিঠিতে অভিযোগ করেছে, গ্রীষ্ম-বর্ষা, রাত-দিন, বন্ধ-খোলা উপেক্ষা করে দ্রুতগতিতে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ চলছে। তারা নিয়োগ কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, এমন কয়েকজনকে শিক্ষক ও কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাঁরা বর্তমান প্রশাসনের বিভিন্ন পদে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সন্তান, স্বামী ও স্ত্রীর মতো ঘনিষ্ঠ স্বজন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য বলেছে, নীতিমালা অনুসরণ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার বলেছেন, তিন ধাপে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, প্রশ্নপত্র তৈরি করা হচ্ছে পরীক্ষার দিন, ফলে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু প্রথম আলোর খবরে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েই কিছু গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি প্রশাসনকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, তাঁর বিভাগে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন নেই। অথচ বিভাগটিতে সাতটি পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগেও শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইউজিসির কাছে এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, পদ অনুমোদনের বিভাগটিতে শিক্ষক অনুমোদনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিগত সব সরকারের আমলেই মেধা ও যোগ্যতা উপেক্ষা করে দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রাজনীতিকীকরণ চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ ও অতি রাজনৈতিক পরিবেশ কোনোভাবেই শিক্ষার পরিবেশের জন্য সুস্থ নয়। এর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন।

চব্বিশের অভ্যুত্থান দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির এই প্রভাব থেকে বের করে আনার সুযোগ তৈরি করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি, অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারে কোনো উদ্যোগই হাতে নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেন আগের আমলের মতোই দলীয় নিয়োগের অভিযোগ উঠবে? আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতিমালা ও মানদণ্ড রয়েছে, সেটা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনিয়মের এই অভিযোগ তদন্তে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে। ইউজিসিকে অবশ্যই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা যাচাই করে দেখতে হবে।