কক্সবাজারের মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সড়কটি নির্মিত হলে দুই ইউনিয়নের মধ্যকার দূরত্ব কমবে—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এমন যুক্তি দিয়েছে; কিন্তু কারা এর সুবিধাভোগী হবেন এবং এর বিনিময়ে পরিবেশের কী ক্ষতি হবে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর অবৈধভাবে বসবাসকারী চার হাজারের বেশি মানুষ এ সড়কের সুবিধা পাবে। অর্থাৎ জনগণের অর্থে নির্মিত সড়কটি কার্যত বনভূমির দখলদারদের বসতি ও অবৈধ স্থাপনায় যাতায়াত সহজ করবে।
সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা জনপদের জন্য সরকারি অর্থে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হলে তা দখলদারদের একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল। এতে এই বার্তাই দেওয়া হবে যে সরকারি জমি কিংবা বনভূমি দখল করে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে পারলে একসময় সেখানে সড়ক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পৌঁছে যায়। এর ফলে বর্তমান দখলদারেরা উৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে বন দখলের প্রবণতাও বাড়বে।
মহেশখালী দেশের একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ দ্বীপ। এখানকার বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সংকটাপন্ন পাহাড়ি কচ্ছপ, মুখপোড়া হনুমান, অজগরসহ বহু প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। প্রাকৃতিক বন, পাহাড়ি ছড়া, জলাধার, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও মাটির অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ে এই বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। বনের মাঝখানে প্রশস্ত সড়ক হলে বন্য প্রাণীর চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হবে, যানবাহনের চাপ ও মানুষের প্রবেশ বাড়বে এবং গাছ কাটা সহজ হয়ে উঠবে।
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক বন বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অন্যান্য বনভূমিতে জাতীয় অপরিহার্য প্রয়োজনে কোনো প্রকল্প নিতে হলেও বিকল্পের অনুপস্থিতি প্রমাণ, নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন। সংরক্ষিত বনে সড়ক নির্মাণ জাতীয় বননীতি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনারও পরিপন্থী। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে।
বন বিভাগের বাধা, মামলা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা জানার পরও নির্মাণকাজ চলতে থাকা আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা। আমরা মনে করি, আদালতের লিখিত আদেশ হাতে পৌঁছায়নি—এমন অজুহাত দিয়ে কাজ অব্যাহত রাখার সুযোগ নেই। সরকারকে অবিলম্বে সড়কের নির্মাণকাজ বন্ধ করে প্রকল্পটি বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে কীভাবে সংরক্ষিত বনের ভেতরে এই প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়ন পেল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। বিদ্যমান দখলদারদের সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে বনভূমি উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিতে হবে।