সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে

আগেভাগে প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইনের পরও হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যু বন্ধ হয়নি। প্রায় নির্মূল হওয়া রোগটি চার মাস ধরে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য প্রায় অপ্রস্তুত আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপও তৈরি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী চিত্র যারপরনাই উদ্বেগজনক।

ডেঙ্গু একসময় ঢাকাকেন্দ্রিক ও বর্ষা মৌসুমভিত্তিক রোগ হলেও এখন এটা গোটা দেশ ও সারা বছরের অসুখ। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৬৮০ জন, মারা গেছেন ৭ জন।

যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম; কিন্তু এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কেননা, সাধারণত জুলাই–আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং বর্ষা শেষ হওয়ার এক–দেড় মাস পরও ডেঙ্গু বাড়তে পারে। ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা বলছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এ ছাড়া নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরম ও বৃষ্টির ধরন বদলানো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতিপূর্ণ জনবসতি, দুর্বল মশকনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা—এর সবকিছুই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের তথ্য বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ছিল। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের হাম, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়াবিষয়ক নিয়মিত সাপ্তাহিক বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে বেশি দেখা যাচ্ছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর একমাত্র পথ হলো এডিস মশা নিধন ও মশার বংশবিস্তার রোধ। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো মশার বংশবিস্তার রোধ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের চেয়ে মশা নিধনের ওপর বেশি মনোযোগ ও অর্থ ব্যয় করে। বৈজ্ঞানিকভাবে এই ভুল পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু মোকাবিলা করা যায় না, গত ২৬ বছরের অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এ ক্ষেত্রে কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ মেনে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে দেশের সিটি করপোরেশনগুলো ও স্থানীয় সরকারগুলোর উচিত সারা বছর এডিস মশা নির্মূলে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর কর্মসূচি পরিচালনা করা।

আমরা মনে করি, ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়লে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা যাতে নিশ্চিত করা যায়, তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে আগেভাগেই প্রস্তুত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদিও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে এবং রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু রোগসংক্রান্ত পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে বলা হয়েছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে গেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর বড় চাপ তৈরি হয়। গ্রাম, মফস্‌সল শহরগুলো থেকে রোগীরা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসতে বাধ্য হন। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। ফলে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নির্দেশ দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, সেটা যেন বাস্তবায়ন হয়; সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। তবে এডিস মশা নির্মূল ও ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আগেভাগে প্রস্তুতি, সমন্বিত ও উদ্যোগ।