নাজুক পুষ্টি পরিস্থিতি

আয় বৃদ্ধি ও খাদ্য কেনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত যে কত বড় ও সুদূরপ্রসারী, দেশি–বিদেশি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোই তার পরিষ্কার সাক্ষ্য দিচ্ছে। এ সময়ে দারিদ্র্য ও অতি দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ক্রমাগত প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে শুধু চাল, ডাল ও আলুর মতো খাবারের খরচ জোগাড় করতেই রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে পুষ্টিকর খাবার থেকে শুরু করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতের খরচগুলো কাটছাঁট করেই জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থা যৌথভাবে বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এফএও, আইএফএডি, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও ডব্লিউএইচওর যৌথ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের ৬ কোটি ৭৮ লাখ বা ৩৯ শতাংশ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারেন না। ২০১৭ সালের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হলেও এটিকে উদ্বেগজনক না বলার কোনো কারণ নেই।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গত বছরের আগস্ট মাসের প্রতিবেদন বলছে, দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। দারিদ্র্য নিরসনে কয়েক দশকের ধারাবাহিক সাফল্যের পর এই উল্টোযাত্রার পেছনে সংস্থাটি মূলত তিনটি বড় কারণ চিহ্নিত করে—কোভিড মহামারি, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে কোভিড মহামারির প্রভাবে সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক অভিঘাত ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা এসে পড়েছিল। সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ায় অনেক দেশই সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারগুলো সময়মতো কাজে লাগানো হয়নি কিংবা সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় সেটা কাজে আসেনি। জুন মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থনীতির নীরব ঘাতক মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে না ধরা গেলে মানুষের ক্রমাগত প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতিও উন্নতি হবে না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটা কেটে গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আগের মতোই রয়েছে। সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিলেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা, চাঁদাবাজি ও হুমকি প্রদানের মতো ঘটনা ঘটছে। এমন উদ্বেগজনক পরিবেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা পকেটের টাকা বের করতে আগ্রহী হন না। এ কারণে অর্থনীতির স্থবির চাকা সচল করতে ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থায় দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানোর বিকল্প নেই।

দেশের ৩৯ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারার সামর্থ্য না থাকার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক পরিবারে নারী ও শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। একজন প্রসূতি মা যদি পুষ্টিকর খাবার না পান, তাহলে তাঁর সন্তানও অপুষ্টি নিয়ে জন্ম নেবে এবং নানা অসুখ–বিসুখে আক্রান্ত হবে। গত কয়েক মাসে হামে যে আট শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তার একটি বড় কারণ পুষ্টিহীনতা বলেই মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। অপুষ্টি নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতির মূলস্রাতে যুক্ত হতে পারে না।

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন সরকারের জন্য সতর্কবার্তা। আশু পদক্ষেপ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা মনে করি, ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি না করা গেলে মানুষের জীবনমানে দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব নয়। সব শ্রেণির মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সক্ষমতা বাড়াতেই হবে।