সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সাঁওতালি মায়েদের সাফল্য

সুমী মুর্মুর প্রতি আমাদের অভিবাদন

মাঠপর্যায়ে কোনো রকম বাইরের সাহায্য বা বড় তহবিল ছাড়া কেবল নিজস্ব উদ্যোগ ও সদিচ্ছায় কীভাবে একটি সমাজকে বদলে দেওয়া যায়, তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাজশাহীর সুমী মুর্মু। তাঁর প্রচেষ্টায় পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে একদিকে শ্রেণিকক্ষে শিশুরা পড়াশোনা করছে, আর ঠিক তার পাশেই বসে মায়েরা সুই-সুতা নিয়ে কাঁথা বুনছেন। আর এই কাঁথা বিক্রির টাকাতে চলছে সেই বিদ্যালয়।

এই গল্পটা মূলত সাঁওতালি মায়েদের, যাঁরা একসময় তীব্র অভাবের তাড়নায় মাঠে দিনমজুরের কাজ করতেন। এই সফলতার পেছনের কারিগর সুমী মুর্মু নিজে এক লড়াকু নারী। নানা পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাধা অতিক্রম করে, বিয়ের পর সন্তান কোলে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছিলেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি যখন দেখলেন নিজ সম্প্রদায়ের মায়েরা মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকায় শিশুরা ধুলামাটি মেখে বড় হচ্ছে এবং অবধারিতভাবে অশিক্ষা, মাদক ও বাল্যবিবাহের বৃত্তে আটকে যাচ্ছে, তখন তিনি আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নেন।

সুমী মুর্মুর এমন উদ্যমী চিন্তা আজ ১৭২ জন আদিবাসী নারীর ভাগ্য বদল করেছে। তাঁদের কেউ মাসে সাড়ে তিন হাজার থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। যে মায়েরা আগে নিজের জন্য একটা সাধারণ ওষুধ কিনতে পারতেন না, তাঁরা আজ সংসারে অর্থ জোগাচ্ছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সুমী মুর্মুর এই মহৎ উদ্যোগের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো—এটি কেবল নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই দেয়নি, বরং একটি ঝরে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। একটি বেসরকারি সংস্থা প্রকল্প শেষে স্কুল বন্ধ করে চলে যাওয়ার পর ভুগরইল ও সন্তোষপুর গ্রামের আদিবাসী শিশুদের ভবিষ্যৎ যখন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন সুমী তাঁর কাঁথা বিক্রির লভ্যাংশ থেকে স্কুল দুটির দায়িত্ব নেন। বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত এই স্কুলগুলোতে কোনো জাতিগত বিভেদ নেই। সেখানে সাঁওতাল শিশুদের সঙ্গে একই মমতায় পড়াশোনা করছে বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের শিশুরাও। এটি আমাদের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

আমাদের দেশে বড় বড় ঋণখেলাপি আর অর্থ পাচারের খবরের ভিড়ে সুমী মুর্মু ও সাঁওতাল নারীদের বোনা নকশিকাঁথাগুলো যেন একেকটি আশার আলো। কোনো সরকারি বা বিদেশি অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বনির্ভর এই মডেলটি দেশের অন্য পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্যও একটি অনুকরণীয় পাঠ হতে পারে। আমরা আশা করব, সুমী মুর্মুর মতো সমাজবদলের কারিগরেরা সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বীকৃতি পাবেন।