সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অপতথ্যের বিস্তার

সম্মিলিত প্রতিরোধ প্রয়োজন

প্রযুক্তিনির্ভর গুজব ও অপতথ্য যেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কোনো রকম বাধাগ্রস্ত না করতে পারে, তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। কেননা দৃশ্যমান সহিংসতা বা প্রকাশ্য হুমকির চেয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি আবেগময় প্রচারণা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ, অপতথ্য কাজ করে চুপিসারে। এটি ভোটারের চিন্তা, ভয় ও সিদ্ধান্তকে ভেতর থেকে প্রভাবিত করে।

২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রথম নির্বাচন। শেখ হাসিনার শাসনামলে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর এবার জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের; কিন্তু সেই প্রত্যাশার ঠিক বিপরীতে সামাজিক মাধ্যমে পরিকল্পিত অপপ্রচারের ঢল ভোটের পরিবেশকে ঘোলাটে করে তুলছে। ডয়চে ভেলে বাংলার প্রতিবেদনে এসেছে, এই অপতথ্যের বড় অংশ আসছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এবং এর একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক রূপরেখা রয়েছে।

এই অপপ্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি ও ভিডিও এতটাই বাস্তব মনে হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য–মিথ্যা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। অস্তিত্বহীন মানুষের মুখে রাজনৈতিক বক্তব্য, জোরপূর্বক ভোটের অভিযোগ, আবেগময় আবেদন—সবই এখন প্রযুক্তির কারসাজিতে তৈরি করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এসব আধেয়র অধিকাংশই কোনো সতর্কতা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে বিশেষ ইউনিট গঠন, সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির গতি ও অপপ্রচারকারীদের সংগঠিত তৎপরতার তুলনায় এসব উদ্যোগ যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ পরিস্থিতিতে শুধু সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। রাজনৈতিক দল, সামাজিক মাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম—সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো। স্মার্টফোনের বিস্তার হয়েছে; কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনো গড়ে ওঠেনি। এই ফাঁকটাই অপপ্রচারকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সের বিষয় নয়, এটি বিশ্বাসের প্রশ্ন। সেই বিশ্বাসের ভিত যদি অপতথ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রযুক্তির এই অসম লড়াইয়ে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নাগরিক—সবারই এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে।