ছুটি বাড়ানোর কারণে কয়েক বছর ধরে আগেভাগে যাঁরা বাড়িতে যান, তাঁরা স্বস্তিতে যেতে পারলেও ঈদযাত্রার শেষ দিনগুলোয় সেই চিরচেনা ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না। এবারও পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপনে যাঁরা শনি ও রোববার প্রথম ভাগে ঢাকা ছেড়েছেন, তাঁরা মোটামুটি স্বস্তিতেও বাড়ি পৌঁছাতে পেরেছেন। তবে ঈদযাত্রার মূল চাপটা শুরু হচ্ছে আজ সোমবার, যেটা অব্যাহত থাকবে মঙ্গল ও বুধবারও। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া হলে ও ব্যবস্থাপনাটি কার্যকর হলে নাগরিকদের ঘরে ফেরা অনেকটা স্বস্তির হয়।
সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে যাত্রীরা ঈদযাত্রায় শামিল হলেও সড়কপথেই বেশির ভাগ মানুষ প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বাড়িতে যান। পরিবহনবিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, ঈদের আগের তিন-চার দিনে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এর বিপরীতে আমাদের গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহন মিলিয়ে সক্ষমতা আছে মাত্র ২২ লাখ। খুব স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা ও জোগানের যে বিপুল ব্যবধান, তাতে করে একটি সুশৃঙ্খল ঈদযাত্রা নিশ্চিত করাটা অন্তত দুরূহ। এর ফলে ফিটনেসবিহীন ও দূরপাল্লায় চলাচলের অনুপযোগী বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে করে মানুষকে বাধ্য হয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে দুর্ঘটনা এবং সড়কের মধ্যে যানবাহন বিকল হয়ে তীব্র যানজটের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এবারের ঈদযাত্রায় ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট—তিন মহাসড়কেই যানজট ভোগাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে হাইওয়ে পুলিশ। ৫ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঈদ প্রস্তুতিমূলক সভায় দেশের মহাসড়কগুলোতে যানজটপ্রবণ ৯৪টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সড়ক উন্নয়নের কাজ, পথে পথে যাত্রী ওঠানামা, টোল প্লাজায় টোল আদায়ের ধীরগতির কারণে যানজট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বরাবরের মতো এবারের ঈদুল আজহায় ঢাকামুখী পশুবাহী ট্রাক ও পশুর হাটের কারণে ঢাকা থেকে বের হওয়া নিয়ে বড় উদ্বেগ রয়েছে। এর ওপর বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে উঠতে পারে।
এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে জনসাধারণের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে ঢাকাসহ আশপাশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিআরটিএ ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাস টার্মিনালগুলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। তবে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, কতটা কার্যকরভাবে সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরেই সড়কের শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তির হবে, তা নির্ভর করে।
মহাসড়ক যতই চার লেন বা ছয় লেন করা হোক, নৈরাজ্যিক পরিবহন খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে না আনতে পারলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা কমবে না। মহাসড়কে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কেন নির্ধারিত সময়ে শেষ না করে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হবে? প্রতিবছর ভোগান্তি হওয়ার পরও টোল প্লাজাগুলোয় কেন সক্ষমতা বাড়ানো হয় না কিংবা আধুনিকায়ন করা হয় না? আমরা মনে করি, মহাসড়কগুলোয় যে ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, তার সব কটিতে সার্বক্ষণিকভাবে ট্রাফিক পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকতে হবে। টোল প্লাজাগুলোয় টোল আদায় আরও গতিশীল করতে হবে। নির্দিষ্ট স্টপেজের বাইরে যাতে কোনোভাবেই বাসগুলো যাত্রী ওঠানামা করতে না পারে, সেদিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। কোরবানির পশুর হাটগুলোর সুশৃঙ্খলার ওপরেও সড়কের শৃঙ্খলা অনেকটাই নির্ভর করে। ফলে সরকারকে পশুর হাট ব্যবস্থাপনার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু সড়কপথ নয়; ট্রেনগুলো যাতে ঢাকা থেকে নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়, সে জন্য নিয়মিত তদারক করা প্রয়োজন। লঞ্চগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা ও লঞ্চঘাটের অব্যবস্থাপনার কারণে এবার যাতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি না হয়, সে জন্য সদরঘাটেও বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে।
সর্বোপরি সমন্বিত পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাই পারে নাগরিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে।